বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তা হওয়া কেন জরুরি?

Spread the love

উদ্যোক্তা বলতে আমরা সাধারণত বুঝি, যিনি উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন। উদ্যোক্তা একটি স্বাধীন পেশা। এই পেশায় বাধা ধরা নিয়মের বাইরে গিয়ে অনেক সুবিধা পাওয়া যায় এবং এতে নিজের পরিচয় তৈরি করা যায়। 

উদ্যোক্তাদের সাধারণত সৃজনশীল শক্তির অধিকারী হতে হয়। বর্তমান সময়ে আমাদেরকে চাকরির পিছনে সময় নষ্ট না করে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য সময়কে কাজে লাগানো উচিত। তাহলে নিজের পাশাপাশি দেশের বেকারত্ব নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করা যাবে। 

তাই প্রথমে জানতে হবে উদ্যোক্তা আসলে কি এবং কেন আমাদের উদ্যোক্তা হওয়া উচিত। 

নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ।

উদ্যোক্তা কি?

উদ্যোক্তা শব্দটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর একটি ফরাসি ক্রিয়াপদ থেকে উদ্ভূত হয়েছে, ‘উদ্যোক্তা’, যার অর্থ “কিছু করা” বা “গ্রহণ করা”। 

“উদ্যোক্তা” এমন কাউকে বুঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যিনি ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন। 

আরো ভালো করে বলতে গেলে বলা যায়, উদ্যোক্তা হলেন একজন ব্যক্তি যিনি তার সীমিত সম্পদ ও পরিকল্পনার সহিত একটি ব্যবসা শুরু করেন এবং সেটি পরিচালনা করেন। 

এই ব্যক্তি অর্থ উপার্জনের জন্য তার ব্যবসায়িক উদ্যোগের সমস্ত ঝুঁকি এবং মুনাফা নিতে ইচ্ছুক থাকেন। 

তার ব্যবসায়িক ধারণাটি সাধারণত চলমান কোন ব্যবসায়িক আদর্শ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয় এবং এটি নতুন পণ্য ও সেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। 

সাধারণত ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তাকে একই ব্যক্তি মনে করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে যেমন একজন ব্যবসায়ী একটি পণ্য বা সেবা শুধু বিক্রয় করে থাকেন অপরদিকে একজন উদ্যোক্তা সেই পণ্য বা সেবা নিজে উদ্ভাবন করে থাকেন। 

এক্ষেত্রে “সকল উদ্যোক্তাই ব্যবসায়ী কিন্তু সকল ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা নন।”

উদ্যোক্তারা একটি উপযুক্ত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করার পরে শ্রম নিয়োগ করে, প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান অর্জন করে, নেতৃত্ব প্রদান করে এবং যোগ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে।

উদ্যোক্তা কেন হবেন?

একজন মানুষ কখন উদ্যোক্তা হতে চায়? সাধারণত যখন সে চাকরি করতে না চায় বা নিজের হাতে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, যখন সে নিজের কোনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায় তখন সে উদ্যোক্তা হওয়ার আশা করে।

তবে চাকরির তুলনায় উদ্যোক্তা হওয়ায় পরিশ্রম ও ঝুঁকি অনেকগুলো ক্ষেত্রে বেশি থাকে। কিন্তু দিনশেষে আপনি জানবেন এই প্রতিষ্ঠানটি আপনার, যা আপনি নিজে শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন। 

আপনি কেন উদ্যোক্তা হবেন সেই কারণগুলোর মধ্যে যে সকল কারণগুলো একান্তই উল্লেখযোগ্য, এর মধ্যে থেকে টি বিষয় নিম্নে উপস্থাপন করা হলো –

১. স্বাধীনতা

যারা উদ্যোক্তা হয় তারা তাদের মেধা ও দক্ষতাকে সৃজনশীল উপায়ে ব্যবহার করতে চায়। উদ্যোক্তা হওয়া তাদেরকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রদান করে। 

যারা একজনের সাফল্যকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র করা যায়। 

অন্য কারো দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা সীমাবদ্ধ না হয়ে আপনি আপনার ভবিষ্যতের জন্য জীবনে যা চান তা করার স্বাধীনতা আপনার থাকবে।

আপনি কতটা ঝুঁকি নিতে চান এবং আপনার জন্য কত ঘন্টা কাজ সঠিক তা আপনি বেছে নিতে পারবেন। 

এ কারণেই উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে পরিপূর্ণ ক্যারিয়ার গঠন করতে পারবেন। এটি এমন একটি পথ যা অনেক সফল ব্যক্তিরা অনুসরণ করেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেন স্টিভ জবস, বিল গেটস এবং রিচার্ড ব্র্যানসন, ইলন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ।

২. নিয়ন্ত্রণ

মানুষের উদ্যোক্তা হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হল আপনার কাজ এবং জীবনের উপর আপনার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। আপনি আপনার নিজের কাজের সময় নিজে নির্ধারণ করতে পারবেন। যা আপনার কর্ম-জীবনের ভারসাম্যের উপরও নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে। আপনি আপনার অধীনস্থদেরকে তাদের দক্ষতা এবং আগ্রহের ক্ষেত্র অনুসারে কাজগুলো অর্পণ করার ক্ষমতাও পাবেন। উদ্যোক্তা হওয়া আপনাকে ইঁদুর দৌড় থেকে বাঁচাবে। 

এখানে আপনিই আপনার বস, তাই আপনি যা অর্জন করতে পারবেন তার কোন সীমা নেই।

৩. আপনি যেখানে চান সেখানে কাজ করুন

উদ্যোক্তারা কেবল ব্যবসায়িক দক্ষতার লোক নয়। তারা স্বপ্নবাজ। অনলাইন মনিটরিং এবং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে, আপনি যে কোনো জায়গা থেকে কাজ করতে পারেন এবং আপনার উদ্যোগ পরিচালনা করতে পারেন। বিশেষভাবে এটি অনলাইন ব্যবসার জন্য সত্য।

৪. উত্তরাধিকার

আপনি আপনার স্বপ্নের ব্যবসাটি তৈরি করে নিজের সন্তানদের জন্য এবং তাদের সন্তানদের জন্য রেখে যেতে পারবেন। নিজের স্বাধীনতার জন্য প্রতিষ্ঠা করা ব্যবসা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনার পরিবারে চলতে পারবে। 

আপনি আপনার সন্তানদের জন্য এমন কিছু রেখে যেতে পারবেন যার জন্য আপনি গর্বিত হবেন। যেমন: আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দিন সাহেব নিজের উদ্যোগের ব্যবসা তার পরিবার এর মাধ্যমে চলমান রেখেছেন এবং তা জীবনের উপর গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।

৫. সৃজনশীল এবং উদ্ভাবক হওয়া

উদ্যোক্তাকে অবশ্যই সৃজনশীল মনের হতে হয়। তাদের উদ্ধাবনী শক্তি থাকতে হয়। কারণ একজন উদ্যোক্তা তার সৃজনশীল শক্তি ও উদ্ভাবনীয় শক্তি ব্যবহার করে ব্যবসায় নিত্য নতুন আইডিয়া নিয়ে আসতে পারে। 

এবং ব্যতিক্রমী পন্যের মাধ্যমে ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। যা তাকে ব্যবসায়ের উন্নয়ন সাধন করতে সাহায্য করে। 

তাই ব্যবসায় উন্নতির জন্য নিত্যনতুন ধারণার মাধ্যমে উদ্যোক্তা আরও বেশি সৃজনশীল এবং উদ্ধাবনী শক্তির অধিকারী হয়ে ওঠেন।

৬. কর্মসংস্থান তৈরি করা

একজন উদ্যোক্তা আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করার মধ্য দিয়ে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য বেকার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়। 

কারণ উদ্যোক্তা যখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে তখন তার ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য আরও লোকের প্রয়োজন হয়। আর যারা তার এই ব্যবসার কাজে সাহায্য করবে তারাই মূলত বেকারত্ব থেকে কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে। 

তাহলে এই উদ্যোগটা নিজের এবং অন্যদের কর্মসংস্থান এর সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।

৭. নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা

উদ্যোক্তা যখন কোন নির্দিষ্ট পণ্য নিয়ে কাজ করবে তখন অবশ্যই তাকে সেই পন্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। 

প্রতিনিয়ত সেই পণ্যটির মধ্যে আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রাহকের কাছে এর পরিচিতি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে পণ্যটির মধ্য দিয়ে একটি ব্র্যান্ড তৈরি করে নিতে পারবে। আর এই কাজটি সম্পন্ন করতে পারে শুধুমাত্র একজন উদ্যোক্তা। 

তাই উদ্যোক্তা নিজেই একটি ব্র্যান্ড।

৮. সীমাহীন উপার্জনের সম্ভাবনা

যেকোনো চাকরিতে, আপনার উপার্জনের সম্ভাবনা বা বেতন আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। আপনি যতই কাজ করুন না কেন আপনার বেতন নির্দিষ্ট থাকে। এখানে আপনার বেতন বৃদ্ধি পেতে পারে বা নাও পারে, আপনি পদোন্নতি পেতে পারেন আবার না ও পারেন। মোটকথা আপনি সেই চাকরিতে যতদিনই থাকুন না কেন আপনার উপার্জনের সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ থাকে। 

আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে সত্যি বলতে আপনি আপনার ব্যবসায় কিছুই উপার্জন করতে পারবেন না, কিন্তু যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তারা একটি লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। 

উদ্যোক্তার সৌন্দর্য হল আপনার আয় নিয়ন্ত্রিত রাখার জন্য কোন সীমারেখা নেই।

৯. লক্ষ্য অর্জন এবং স্বপ্ন পূরণ

যদি কারও স্বপ্ন থাকে পরিবার ও সমাজের কাছে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করার তাহলে অবশ্যই একজন উদ্যোক্তা হওয়ার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করার দৃঢ় মনোবল রাখতে হবে। 

নিজেকে পরিশ্রমী হয়ে উঠতে হবে। 

সুতরাং নিজের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য উদ্যোক্তা হবার বিকল্প নেই।

এছাড়া একজন উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে আরো একাধিক কারণ রয়েছে। তবে এ সকল কারণগুলো একজন উদ্যোক্তার মধ্যে অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায়। 

শেষকথা

আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষই উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করে তবে তাদের মধ্যে কত শতাংশ মানুষ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে তা বলা মুশকিল। 

যখন বুঝতে পারবেন আপনি কেন উদ্যোক্তা হতে চান আর এ বিষয়ে আরো বিস্তরভাবে গবেষণা করতে পারেন তাহলেই কেবল একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন। 

বেশিরভাগ উদ্যোক্তা অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি তাদের আবেগকে ও অনুসরণ করে। নিজেদের উপর তাদের খুব দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে এবং তারা শুধুমাত্র অর্থের জন্য উদ্যোক্তা হতে চায় না বরং তারা বিশ্বকে পরিবর্তন করার জন্য উদ্যোক্তা হতে চায়।

তাই আপনি যদি দেশ বা পৃথিবীকে কিছু দিতে চান, বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তা হওয়াই আপনার জন্য সব থেকে সহজ পন্থা হবে।

Leave a Comment