কিভাবে অনলাইন থেকে সহজে আয় করা যায়?

মানব জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো মানসম্মত কর্মসংস্থানে কাজ করে প্রতিষ্ঠান ও নিজেকে আর্থিক ভাবে লাভবান করা। সময়ের স্রোতে বর্তমানে অনেক ধরনের কর্মসংস্থান যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি অসংখ্য সুযোগ তৈরি হয়েছে রিমোট জব করার। যেকোনো স্থানে অবস্থান করে সুবিধামতো সময় ব্যায় করে অনলাইনে বিভিন্ন কাজ করে অর্থ উপার্জন করা যায় খুব সহজেই!
হ্যাঁ, ১০/১২ বছর আগেও বাংলাদেশের জন্য অনলাইনে আয় খুব একটা সহজ না হলেও এখন অনেকেই মুক্তপেশা বা ফ্রিল্যান্সিংকে বেছে নিয়েছেন অনলাইনে আয়ের মাধ্যম হিসেবে। ফ্রিল্যান্সিং অনলাইনে আয় করার জনপ্রিয় একটি পেশা। তবে অনলাইনে আয় করে রাতারাতি বিলিয়নিয়ার হওয়া সম্ভব নয়।

এই পেশায় নিজেকে সফল করতে হলে অনেক ধৈর্য্য ও ইচ্ছাশক্তি নিয়ে কাজ করতে হয়, এবং এর জন্য প্রয়োজন সঠিক গাইডলাইন। চলুন জেনে নেয়া যাক কিভাবে অনলাইনে সহজে আয় করা যায়–

কি কি প্রয়োজন অনলাইনে সহজে আয় করার জন্য?

অনলাইনে আয় করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন স্মার্ট ডিভাইস (স্মার্টফোন বা কম্পিউটার), ইন্টারনেট সংযোগ ও এক বা একাধিক বিষয়ে দক্ষতা। জ্বি , বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সত্যি যে- হাতের স্মার্টফোন টি দিয়েও অনলাইন থেকে আয় করা যায়! তবে অনেক প্রতারক অনলাইনে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে হ্যাক করে নেয় বিভিন্ন তথ্য। তাই সচেতনভাবে বিশ্বস্ত প্লাটফর্মে যেন কাজ করা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। যে যে উপায়ে অনলাইন থেকে সহজে আয় করা যায় তা তুলে ধরা হলোঃ–

১. ভার্চ্যুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট

ফ্রিল্যান্সিং জগতের অধিকাংশ কাজ সম্পাদন করা হয় ভার্চ্যুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট এর মাধ্যমে। ভার্চ্যুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট বলতে বোঝায় অনলাইনে বিভিন্ন কর্পোরেট অফিসের বা কোনো উদ্যোক্তার চাহিদামতো কাজ করে তার বিনিময়ে অর্থ নেয়া। এই কাজ করতে হলে কাজের প্রতি আগ্রহী হতে হবে। রিমোট জব হিসেবে এটি অনেকের কাছেই জনপ্রিয় পেশা। বিশেষত মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, মাইক্রোসফট এক্সেল এ দক্ষতা থাকলে এ কাজ সহজেই করা যায়। তাছাড়াও ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী ডাটা এন্ট্রি, ডাটাবেস আপডেট অথবা ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল কমিউনিকেশন, টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমেও ভার্চ্যুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে অসংখ্য কাজ করা যায়।

২. অনুবাদক

প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সেজন্য প্রয়োজন মাফিক নানান আর্টিকেল, বই ইত্যাদি অনুবাদ করার চাহিদাও বেড়েছে। এমন অনেক ক্লায়েন্ট আছেন যারা অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে অনুবাদক হায়ার করেন। আপনি যদি নিজেকে একাধিক ভাষায় দক্ষ করতে পারেন তাহলে এটি হতে পারে আয়ের চমৎকার উৎস।

৩. অনলাইন প্রশিক্ষণ

উন্নত দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপক হারে অনলাইন কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একাধিক উপায়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করছেন অনেকেই। তন্মধ্যে অন্যতম হলো অনলাইনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া। অর্থ ও সময়ের অপচয় রোধ করে প্রশিক্ষণার্থী যেমন সহজেই শিখতে পারছেন অনেক কিছু, তেমনি প্রশিক্ষক ও উপার্জন করতে পারেন ঘরে বসেই।

কেউ চাইলে একাডেমিক কোর্স করাতে পারেন, আবার নন-একাডেমিক যেমন কুকিং, বেকিং, ক্রাফটিং, ফ্রিল্যান্সিং, গান, কবিতা আবৃত্তি, স্পোকেন ইংলিশ ইত্যাদি কোর্স করাতে পারেন। যে যেই বিষয় এ দক্ষ সেই বিষয় নিয়েই কাজ করতে পারছেন।

৪. ভয়েস ওভার আর্টিস্ট

সম্প্রতি ডিজিটাল মিডিয়ার সম্প্রসারণ হওয়ার দরুন অসংখ্য ভয়েস ওভার আর্টিস্ট এর কাজ র‍য়েছে। নানারকম আর্টিকেল, বিজ্ঞাপন, ইউটিউব-ফেসবুক ভিডিও বা ব্লগ, কবিতা আবৃত্তি, গান, বিভিন্ন চরিত্রের মিমিক্রি ইত্যাদির জন্য নিজের কন্ঠে মানানসই ভয়েস তৈরি করে তার সাথে জুড়ে দিলেই ক্লায়েন্ট তার বিনিময়ে অর্থ প্রদান করে থাকেন।

প্রমিত ভাষায় শব্দচয়ন, সুন্দর বাচনভঙ্গি, কথায় জড়তা না থাকা, কিংবা কাজের প্রয়োজনে নানান ভাষায় ও ভঙ্গিমায় কথা বলতে পারার গুণ থাকলে এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা যায়।

৫. ইউটিউবের মাধ্যমে আয়

বর্তমানে অনলাইনে আয় করার অন্যতম সহজ প্লাটফর্ম হলো ইউটিউব। ইউটিউব চ্যানেল খোলার পর মানসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য ভিডিও আপলোড দিয়ে তা থেকে গুগুল অ্যাডসেন্সের মাধ্যমে আয় করা যায়। ডেইলি লাইফস্টাইল, ফুড/গ্যাজেট/প্রোডাক্ট রিভিউ, আর্ট, বিভিন্ন কোর্স, ট্রাভেলিং, তথ্যবহুল ভিডিও ইত্যাদি আপলোড দেয়ার মাধ্যমে চ্যানেলের মনিটাইজেশন অন করতে পারলে সেই চ্যানেলে দেখানো অ্যাড এর জন্য অর্থ পাওয়া যায়।

৬. কন্টেন্ট রাইটিং

শুধু ডিজিটাল মিডিয়ার সম্প্রসারণ হলেই হবেনা, এগুলো ধরে রাখতে প্রয়োজন যোগ্য কন্টেন্ট এর। এমন অনেক মিডিয়া রয়েছে যারা মানসম্মত আর্টিকেল এর অভাবে হারিয়ে গেছে। তাই অনেকেই কন্টেন্ট রাইটার হায়ার করে থাকেন অনলাইনে। একজন ডাক্তার যেমন সহজে ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝবেন না তেমনি কন্টেন্ট রাইটার ব্যতীত অন্য কেউ ভালো মানের কন্টেন্ট লিখতে পারবেন না। আপনি যদি ভালো কন্টেন্ট লিখতে পারেন তাহলে বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে (Fiverr, Upwork, Freelancer.com, Toptal, Guru, Aykori.com ইত্যাদি) কন্টেন্ট রাইটার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন।

৭. মতামত শেয়ারের মাধ্যমে আয়

অনেক সাইট আছে যেগুলোর সার্ভে তে অংশগ্রহণ করে বেশ ভালো টাকা রোজগার করা যায়। Google Opinion Rewards, Poll pay ইত্যাদির মতো অ্যাপ গুলো এরকম সুবিধা দিয়ে থাকে।

৮. PTC এর মাধ্যমে আয়

PTC মানে পেইড-টু-ক্লিক এর মাধ্যমে উপার্জন করা। কিছু ওয়েবসাইট তাদের বিজ্ঞাপন এ ক্লিক করলে বা ভিডিও দেখলে তার বিনিময়ে টাকা দেয়। মূলত বিভিন্ন কোম্পানির মার্কেটিং করে তার বিনিময়ে অর্থ দেয় এ সাইট গুলো। তবে এ ধরনের সাইট অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া হয়ে থাকে। তাই বিশ্বস্ত সাইট এ কাজ করতে হবে। রিসোর্স হিসেবে গুগুল, ইউটিউব থেকে প্রচুর ধারণা নেয়া যায়। জনপ্রিয় একটি পিটিসি সাইট হচ্ছে Neobux।

৯. অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে প্রধানত অন্য কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরোক্ষভাবে বিক্রি করে তা থেকে কমিশনের মাধ্যমে আয় করা যায়। এজন্য নিজস্ব অনলাইন মাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। যেমন কেউ রান্নার রেসিপি এবং টিপস সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত আপলোড করেন, তিনি চাইলে সহজেই কিচেন আইটেম এর অ্যাফিলিয়েশন এর মাধ্যমে আয় করতে পারবেন। তবে রাতারাতি বিক্রয় বৃদ্ধি সম্ভব না হলেও একাগ্রতার সাথে লেগে থাকলে সফল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

১০. ফেসবুক বিজনেস পেজ

বর্তমান প্রজন্ম ধরাবাঁধা চাকুরী না করে উদ্যোক্তা হওয়া কে তুলনামূলক ইতিবাচক ভাবে দেখছেন। অনেকে ইতোমধ্যে সফলতার মুখ ও দেখেছেন। আপনি যদি একজন উদ্যোক্তা হয়ে থাকেন বা হতে চান, সেক্ষেত্রে ফেসবুক পেজ আপনার কাজটি আরও সহজ করে তুলতে পারে। অনেক উদ্যোক্তা বিভিন্ন পণ্য ফেসবুকে প্রচার ও প্রসার এর মাধ্যমে আয় করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হওয়ায় দ্রুত অন্যদের নিকট পণ্যের গুণগত মান, সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি তুলে ধরা যায়, ফলে বিক্রয় বৃদ্ধি পায়।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, অনলাইনে আয়ের আরও অনেক উপায় রয়েছে। এখানে সহজতর কিছু উপায় তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো করতে গেলে খুব বেশি দক্ষতার প্রয়োজন নেই। তবে মনে রাখতে হবে– যার যোগ্যতা যত বেশি তার কাজের চাহিদাও ততো। তাই নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করতে পারলে অনলাইন হতে পারে আয়ের চমৎকার মাধ্যম।

Leave a Comment