ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: যেভাবে শুরু করবেন

স্বচ্ছ ও দ্রুততর নিয়োগ প্রক্রিয়া, স্মার্ট ক্যারিয়ার, বৈধ উপায়ে আর্থিক সচ্ছলতার সুযোগ, সামাজিক মর্যাদা প্রভৃতি কারণে তরুণদের মধ্যে ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করার আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলছে। এছাড়া মুদ্রানীতি প্রণয়ন, দেশের আর্থিক নীতিমালা প্রণয়ন, বড় বড় প্রজেক্টে সরাসরি কাজের সুযোগ থাকায় ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যাংকে চাকরি (ব্যাংক জব) অনেক গ্র্যাজুয়েটের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে।

দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাংক জব এখন অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এখনকার মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাবে দেশে বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে সাথে গড়ে উঠেছে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা। আজকাল পেশা হিসেবে ব্যাংকিং অনেকটাই বিশেষায়িত হয়ে উঠেছে এর বহুমুখী সুযোগ-সুবিধাগুলোর জন্য।

এই সেক্টরটি তুলনামূলক বড় হওয়ায় এখানে সারা বছরই দক্ষ কর্মকর্তার প্রচুর চাহিদা থাকে। বর্তমানে প্রায় সব ব্যাংকেরই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তাই বর্তমানে সঠিক প্রস্ততি ও নিয়মিত পড়াশোনা করলে সহজেই ব্যাংকিং সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।

এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরির সুবিধা, প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরির যোগ্যতা, ব্যাংকে নিয়োগের সার্বিক প্রক্রিয়া ও ব্যাংকিং সেক্টরে নিয়োগ সংক্রান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি, অর্থাৎ ব্যাংক জব (Bank Job) প্রস্ততি বিষয়ে ধাপে ধাপে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আশা করি আলোচনাটি সকল চাকুরী প্রার্থী, বিশেষ করে যারা ব্যাংকে চাকরির প্রস্তুতি একদম নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছেন তাদের জন্য অনেক উপকারী হবে।

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: ব্যাংক জব যোগ্যতা

ব্যাংকের চাকরি পেতে বা করতে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ তেমন কোনো বিষয় নয়। আসল বিষয়টা হলো পরীক্ষায় ভালো করা। যেকোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি থাকলেই চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। তা ছাড়া ব্যাংকের বিশেষায়িত বিভাগ যেমন আইটি, প্রকৌশল, পরিসংখ্যান, লাইব্রেরি, মেডিকেল- এ সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে ডিগ্রিধারীরা আবেদন করতে পারেন।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শাখা বাড়ায় কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। সাথে সাথে উন্নত গ্রাহকসেবা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছে। যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপক সুযোগ সুবিধা। তাই স্নাতক পাস করেই ব্যাংক জব প্রস্তুতি শুরু করে দিন।

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: ব্যাংক জব সিলেবাস ও মানবন্টন

বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরন করে নিয়োগ দেওয়া হয়। পদভেদে এসব ব্যাংক জব প্রস্তুতির জন্য দরকার হয় আলাদা প্রস্তুতির। তবে কিছু কমন বিষয়ে মিল থাকে।

ব্যাংক জব পরীক্ষার মানবণ্টন

পরীক্ষার নাম মার্কস

প্রিলিমিনারি ১০০

লিখিত ২০০

মৌখিক ২৫

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: প্রিলিমিনারি

যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক বাছাই করা হয়। এই ধাপ থেকে অনেকেই বাদ পড়েন। তাই এই ধাপ অনেক গুরত্বপূর্ণ সামনে এগিয়ে যাবার জন্য।

সরকারি ব্যাংক এর ক্ষেত্রে ১০০ নাম্বারের এমসিকিউ পরীক্ষা হয়। এতে উত্তর করতে হয় ৮০ নাম্বার। প্রতিটি সঠিক উত্তর এর জন্য ১ দশমিক ২৫ নাম্বার, আর ভুল উত্তরে ০ দশমিক ২৫ নাম্বার কাটা যায়।

প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে বিগত পাঁচ-ছয় বছরের পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন সমাধান করা। প্রশ্নের বিষয়গুলোর ওপর স্বচ্ছ ধারণা রাখা। এছাড়া খবরের কাগজের ইংরেজি আর্টিকেলগুলো পড়তে হবে।

অনলাইনে পড়াশোনা করার সেরা ১০ ওয়েবসাইট (ফ্রি) বিস্তারিত জানতে- ভিজিট করুন

প্রিলিমিনারি প্রশ্নের বিষয়বস্তু ও মানবণ্টন

বিষয়বস্তু                          নাম্বার বণ্টন

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য     ২০

ইংরেজি                            ২০

গণিত ও মানসিক দক্ষতা   ৩০

সাধারণ জ্ঞান                    ২০

কম্পিউটার                     ১০

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: লিখিত পরীক্ষা

ব্যাংক জব প্রস্তুতির জন্য লিখিত পরীক্ষার ভালো প্রস্ততি থাকা আবশ্যক। এর জন্য বিগত সালগুলোর প্রশ্ন সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে হবে। শব্দভাণ্ডার বাড়াতে হবে। শব্দগুলো দিয়ে বানান ভুল ছাড়া বাক্য তৈরি করা পারতে হবে। ব্যাকরণ এ ভালো হতে হবে।

লিখিত প্রশ্নের বিষয়বস্তু ও মানবণ্টন

বিষয়বস্তু নাম্বার বণ্টন

বাংলা ২৫-৩০

ইংরেজি ১০০ এর বেশি

গনিত ৫০-৭০

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি:গণিত সিলেবাস এবং যা যা পড়তে হবে

লিখিত পরীক্ষাকে মাথায় রেখে গণিত করলে ব্যাংক জব প্রস্তুতি ভালভাবে নেয়া সম্ভব হয়। গণিতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গণিত বুঝতে পারা। কারণ গণিত প্রশ্ন করা হয় ইংরেজি ভার্সন এ।

গণিত থেকে শতকরা, সুদ-আসল, লাভক্ষতি, বিন্যাস-সমাবেশ, অংশীদারি কারবার, বয়স, অনুপাত, লসাগু-গসাগু, সরল, ঐকিক নিয়ম, বর্গ, মান নির্ণয়, সামান্তধারা নির্ণয়, সাধারণ চার নিয়ম, সমাধান  জ্যামিতিক সূত্র ও সংজ্ঞা, এবং সমীকরণ এর মতো বিষয় থেকে প্রশ্ন এসে থাকে।

গণিতকে বীজগণিত, পাটিগণিত, ও জ্যামিতি এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। জ্যামিতি থেকে প্রশ্ন খুব কম আসে। তাই বাকি দুই অংশকে বেশি গুরুত্ব দিলে ফল ভালো আসে।

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি:সাধারণ জ্ঞান সিলেবাস

ব্যাংক জব প্রস্তুতির জন্য সাধারণ জ্ঞান তিন ভাগে ভাগ করে পড়া যেতে পারে। সাধারণ জ্ঞান, সাম্প্রতিক সাধারণ জ্ঞান, এবং বাংলাদেশ বিষয়াবলী।

সাম্প্রতিক সাধারণ জ্ঞান থেকে ৪/৫ নাম্বারের প্রশ্ন আসে। প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়লে এবং সংবাদ দেখলে তার ২/৩ নাম্বার পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে আর্থিক খাতের বিভিন্ন তথ্য, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, আমদানি-রপ্তানি খাত ইত্যাদি থেকে প্রশ্ন এসে থাকে। সাধারণ জ্ঞান নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কিছু নেই। কমন প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারলে আর গণিত এবং ইংরেজিতে ভালো করলে ফল ভালো আসবে।

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: কম্পিউটার সিলেবাস

কম্পিউটার যন্ত্র পরিচিতি, বাইনারি নাম্বার, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এবং এক্সেল শর্টকাট, সোশ্যাল মিডিয়া, গেইট মেকানিজম ইত্যাদি বেসিক জিনিস থেকে প্রশ্ন এসে থাকে।

এছাড়াও বিজ্ঞান থেকেও বিভিন্ন আবিষ্কার ও আবিষ্কারক, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, আলো, তাপ, শব্দ, বিদ্যুৎ, চুম্বক, উদ্ভিদ ও প্রাণিবিদ্যা, মানবদেহ, খাদ্য ও পুষ্টি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, মহাকাশবিজ্ঞান, বায়ুমণ্ডল, ভূগোল, প্রাকৃতিক ভূগোল, খনিজ ও মৃত্তিকা, যন্ত্রবিদ্যা, ইলেক্ট্রনিক্স, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে প্রশ্ন এসে থাকে।

ব্যাংক জব প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় প্র্যাকটিস করা। বিভিন্ন মডেল টেস্ট দেওয়া এবং অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা। পাস না করলেও আত্মবিশ্বাস বাড়বে এমন পরীক্ষায়।

ব্যাংক জব প্রিলিমিনারি পরীক্ষা: ইংরেজি বুকলিস্ট

ব্যাংক জব প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ইংরেজির প্রস্তুতির জন্য যেসব বই পড়তে পারেন তা হলো:

Cliff’s Toefl,

Applied English Grammar and Composition,

A Passage to English Grammar,

English for Competitive Exam,

APEX English,

Master English Grammar.

ইংরেজি ব্যাকরণ অংশের জন্য Cliff’s Toefl ও পি.সি. দাস রচিত Applied English Grammar and Composition বই দুটি আমার কাছে বেশ ভালো হয়েছে। তবে যাদের ভিত্তি একেবারেই দুর্বল, তাদের জন্য এস.এম. জাকির হোসেন রচিত A Passage to English Grammar বইটি অনেক ভালো হবে। তবে নিয়মিত অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। অনুশীলনের জন্য বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন বই যেমন, English for Competitive Exam, APEX English, Master English Grammar ইত্যাদি থেকে আপনার পছন্দমত যেকোনো বই থেকে প্রতিদিন অনুশীলন করবেন। Appropriate Preposition, Group Verb, Proverb, Idioms and Phrases অংশগুলো এসব বই থেকে অনুশীলন করলেই চলবে।

ব্যাংক জব প্রস্তুতি: ফোকাস রাইটিং

ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন সঠিকভাবে উত্তর করার জন্য লিখিত পরীক্ষায় ফোকাস রাইটিং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য বাংলা ও ইংরেজি রাইটিং স্কিল ভালো হতে হয়। এখানে অনেক বেশি লেখার সময় ও স্থান নেই। তাই খেয়াল রাখতে হবে যাতে লেখার সময় বাক্য গঠন শুদ্ধ হয়, বাক্যে বানান ও ব্যাকরণগত ভুল না হয়, শব্দচয়ন সুন্দর ও আধুনিক হয় এবং সর্বোপরি লেখাটি যাতে তথ্যসমৃদ্ধ হয়।

ফোকাস রাইটিংয়ের জন্য নিম্নোক্ত টপিকগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখতে পারেনঃ

 Megaprojects run by the government,

 Foreign currency reserve,

 Economic zones and their impact,

 Poverty and development in Bangladesh,

  Women empowerment,

 Any recent global and local issue

 Cyber Security for Banking Sector,

 Initiatives taken by the central bank during the Covid-19 pandemic,

 Money laundering and anti-money laundering initiatives

 Fiscal policy and monetary policy,

 Single-digit interest rate,

এছাড়া প্রতিদিন একটি করে ইংরেজি থেকে বাংলা ও বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ করার অভ্যাস থাকলে দ্রুত সময়ে অনুবাদ, ভোকাবুলারি ও ফোকাস রাইটিং বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। 

ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: মৌখিক পরীক্ষা

সরকারি ব্যাংক জবের মৌখিক পরীক্ষায় মাত্র ২৫ নম্বর থাকে। এজন্য বিসিএস এর মত আলাদাভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ভাইবা বোর্ডে আপনার স্মার্টনেস, প্রেজেন্টেশন ও কথা বলার ধরন চেক করা হয়। আপনি যদি বেয়াদবি না করেন তাহলে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও আপনাকে ফেল করাবে না।

বোর্ডে সবসময় পজিটিভ থাকবেন। কোন উত্তর না জানা থাকলে বিনয়ের সাথে অপারগতা জানাবেন, তবে কনফিডেন্টলি ভুল উত্তর দেওয়া পরিহার করবেন। সাধারণত বাংলাতেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, তবে ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস থাকাটাও জরুরী। ভাইবা বোর্ডে যাওয়ার আগে নিচের টপিকগুলো দেখে যেতে পারেনঃ

নিজ নামের অর্থ

নিজ জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

মুক্তিযুদ্ধ

সাম্প্রতিক আলোচ্য বিষয়

যে ব্যাংকের চাকুরীর পরীক্ষা দিচ্ছেন সেই ব্যাংকের সাধারণ কিছু বিষয়

অনার্সে পঠিত বিষয়

ব্যাংকিং সম্পর্কিত টার্ম

এ বিষয়গুলো পড়ে গেলে আশা করি ভাইবা বোর্ডে ভালো করবেন

পরিশেষে, মনোবল আর আত্মবিশ্বাসী  না হতে পারলে বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। নিজের মধ্যে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে যে আপনার দ্বারাই সম্ভব। মানসিকভাবে শক্ত হয়ে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। পড়াশোনার মোক্ষম সময়কে কাজে লাগান। সফলতা আপনার হাতে  ধরা দিবেই। ইনশাআল্লাহ।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ টিপস্ জানতে– ভিজিট করুন

1 thought on “ব্যাংক চাকরির জন্য প্রস্তুতি: যেভাবে শুরু করবেন”

Leave a Comment