অ্যালকোহল:বরণীয় নাকি বর্জনীয়

Spread the love

কথায় আছে-মদের নেশা সর্বনাশা।দীর্ঘদিন ধরে এ্যালকোহল গ্রহনের ফলে শরীরে বাসা বাঁধে নানান মরণব্যাধি।নেশার জগতে পা বাড়ালে মানুষ ক্ষয়ে-ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। মাদকাসক্তি মানুষকে জ্ঞানশূণ্য করে দেয়। সামাজিক বন্ধন ও সম্মানের কোনো চিন্তাই তার থাকে না।এছাড়াও অর্থনৈতিকভাবেও এটি মানুষের ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়।তাই সময়মত এই নেশা নিরাময় করা অত্যন্ত জরুরি। 

অ্যালকোহল কি? 

রসায়নে অ্যালকোহল বলতে এমন সব জৈব যৌগকে বোঝায়, যাদের হাইড্রক্সিল কার্যকারী গ্রুপটি একটি অ্যালকাইল বা অ্যারাইল গ্রুপের কার্বনের সাথে একটি বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। 


অথবা, অ্যালকোহল হলো সে সব যৌগ, যা কিনা হাইড্রোকার্বনের এক বা একাধিক হাইড্রোজেন পরমানুকে অনুরূপ সংখ্যক হাইড্রক্সিলমূলক (OH) দ্বারা প্রতিস্থাপিত করলে যা পাওয়া যায়।  

যেমনঃCH4(মিথেন) মিথাইল অ্যালকোহল। CH3-CH3(ইথেন) ইথাইল অ্যালকোহল। CH3-CH3-CH3(প্রোপেন) প্রোপোইল অ্যালকোহল। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রেই অ্যালকোহল বলতে ইথাইল অ্যালকোহলকেই বোঝানো হয়েছে। অন্যান্য অ্যালকোহলের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ নাম ব্যবহার করলেও অ্যালকোহলের আলোচনায় শুধুমাত্র ইথাইল অ্যালকোহল নিয়েই আলোচনা হয়েছে। 

অপরদিকে অ্যালকোহল শব্দটি আরবি শব্দ “আল-কুহ” থেকে এসেছে। যার অর্থ সাধারণভাবে ইথানল। ইথানল বর্ণহীন এক ধরণের উদ্বায়ী তরল যা গাঁজনের মাধ্যমে আখ থেকে তৈরি করা যায়। 

নেশার উপসর্গঃ      

যারা নিয়মিত মদ্যপান করে থাকেন, তাঁদের জন্য এই অভ্যাস ত্যাগ করা কঠিন। কিছু উপসর্গ দেখা দেয়, তা বোঝায় যে সহজে তিনি মদ্যপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেন না।যেমনঃ             

১) এক দিনও মদ্যপান না করে থাকতে পারেন না, 

২) সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানেই মদ রাখছেন, 

৩) যখন মদ্যপান করছেন না, তখনও মদ নিয়েই ভাবছেন, 

৪) মদ্যপান করতে শুরু করলে থামতে পারেন না, 

৫) পরিমাণে অনেকটা পান করেন ইত্যাদি।  

ইসলামের দৃষ্টিতে অ্যালকোহলঃ  

লোকেরা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এর মধ্যে আছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও, কিন্তু এগুলোতে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি’  

               (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২১৯)।  

কুরআনের এ আয়াতে বলা হয়েছে, মদ ও জুয়াতে যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে কিছু উপকারিতা পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু দু’টির মাধ্যমেই অনেক বড় বড় পাপের পথ উন্মুক্ত হয়, যা এর উপকারিতার তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর। 

এরপর বলা হলো, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, এগুলো শয়তানের কার্য। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো’

                (সুরা-৫ মায়েদা, আয়াত: ৯০)।  

সবশেষে আল্লাহ্‌ বলছেন, ‘শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদিগকে আল্লাহর স্মরণে ও নামাজে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?’ 

                                (সুরা-৫ মায়েদা, আয়াত: ৯১)।  

হযরত আনাস রা. বলেন, রসুল সা. মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ ব্যক্তিকে লানত করেছেন। ১. মদ প্রস্তুতকরী। ২. মদের ফরমায়েশ দানকারী। ৩. মদ পানকারী। ৪. মদ বহনকারী। ৫. যার কাছে মদ নিয়ে যাওয়া হয় সে ব্যক্তি। ৬. যে মদ পান করায়। ৭. মদ বিক্রেতা। ৮. মদের মূল্য ভোগকারী। ৯. মদ ক্রয়কারী। ১০. যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়।  

                                      (মেশকাত ২৭৭৬) 

অর্থাৎ ইসলামে মদ্যপান বা অ্যালকোহল পান শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত 

মানবদেহে অ্যালকোহলের প্রভাবঃ 

  • একটানা অনেকদিন ধরে অনিয়ম করলে তার প্রভাব শরীরের উপর পড়ে আর এক্ষেত্রে শরীরে খারাপ প্রভাবই কিন্তু হয়যে খাবার শরীরের জন্য ভাল নয় তা এড়িয়ে যাওয়াই ভাল 
  • মদ্যপান অনেক রকম রোগকে ডেকে আনেশরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে যায়আর কোনও শারীরিক সমস্যায় পরিস্থিতি দ্রুত হাতের নাগালের বাইরে বেরিয়ে যায় 
  • মদ্যপান আমাদের স্নায়ুকে অবশ করে দেয়মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যায় 
  • মদ্যপান ওজনও বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন মদ্যপান করলে ওবেসিটির সমস্যা আসে। যা শরীরের জন্য খুব খারাপ 
  • অ্যালকোহল পান করলে মানুষের রক্তচাপ ও রক্তের কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে যে রক্তনালী – সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যার ফলে স্মৃতি লোপ পেতে পারে 

অ্যালকোহল বর্জনের উপায়ঃ 

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে মিরাজের রাতে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি দেখানো হয়েছে। ‘তিনি মদ, মাদক ও নেশা গ্রহণকারীদের শাস্তি দেখলেন। তারা জাহান্নামিদের শরীর থেকে নির্গত বিষাক্ত নোংরা পুঁজ পান করছে’ (বুখারি ও মুসলিম, মিরাজ অধ্যায়)। ফিকাহ তথা ইসলামি ব্যবহারিক বিধানমতে মাদক গ্রহণ হারাম হওয়ার পাশাপাশি তা অপবিত্রও। কোনো মুসলমানের মাদক ব্যবহার করা যেমন হারাম, অনুরূপভাবে তা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা এবং ক্রয়–বিক্রয় করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।  

কোন নেশাই রাতারাতি বাদ দেয়া অসম্ভব।উপরন্তু মাদক গ্রহণ এমন এক অপরাধ, যা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না; বরং মাদকসেবী নিজেই মাদক বা নেশার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। চাইলেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যায় না। অর্থাৎ, সে নেশাকে ছাড়তে চাইলেও নেশা তাকে সহজে ছাড়ে না বা ছাড়তে চায় না। তবে নিয়মিত চেষ্টা করলে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।যেমনঃ  

১) প্রথমেই পরিমাণ কমানোর চেষ্টা না করে, একেবারে মদ্যপান না করে কাটানোর চেষ্টা করতে হবে কয়েকটি দিন। প্রথমে কষ্ট হবে, কিন্তু তার পর সামলেও নেয়া যাবে 

২) দিনের একটি সময়ে খুব বেশি করে মদ্যপানের টান বাড়লে যে কোনও  কোমল পানীয় খাওয়া যায়যত বার মদ্যপান করতে ইচ্ছা করবে, তত বার পানি বা অন্য পানীয় খেতে পারে 

৩) দিনের যে সময়ে সাধারণত মদ্যপান করা হয়, সে সময়ে অন্য কোনও কাজের পরিকল্পনা রাখতে হবে সময়টি ফাঁকা না রাখা 

৪) শরীরচর্চাও সাহায্য করে মদ্যপানের অভ্যাসে কিছুটা রাশ টানতে 

৫) উপরের উপায়গুলিতে একেবারেই কাজ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবেনিয়মিত থেরাপি এবং ওষুধ অনেকটাই সাহায্য করতে পারে মদ্যপান নিয়ন্ত্রণ করতে 

সর্বোপরি,ইসলামি মূল্যবোধ ও আল্লাহ্‌র স্মরণ এবং শাস্তির ভয় মদ বা অ্যালকোহল থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে সহায়তা করে।  

  

অ্যালকোহলের উপকারিতাঃ 

অ্যালকোহল ক্ষতিকর হলেও কিছু ক্ষেত্রে এর উপকারিতাও পাওয়া যায়।যেমনঃ 

  • চিকিৎসায়ঃ অ্যালকোহল থেকে অনেক দুরারোগ্য রোগের পথ্য তৈরি হয় 
  • খাদ্য সংরক্ষণেঃ অ্যালকোহল দ্বারা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়া সম্পাদন করা হয়।  
  • বাহ্যিক ব্যবহারঃ পারফিউম,সেন্ট,প্রসাধনী,রং বা কালি ইত্যাদি তৈরিতে অ্যালকোহল ব্যবহৃত হয় 

পরিমিত মদ্যপান কি বিপদমুক্ত? 

এর কোন সোজাসুজি জবাব দেয়া কঠিন।কারণ এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। তবে তাদের ফলাফলগুলো পরস্পর বিরোধী।কিছু গবেষণায় বলা হয়, দিনে দুই ইউনিট পর্যন্ত লাল ওয়াইন পান করা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কিন্তু এ নিয়ে অন্য কিছু বৈজ্ঞানিকের সংশয় আছে। 

মোট কথা, অ্যালকোহল পান ইসলামে তো বটেই সর্বসম্মতিক্রমে ক্ষতিকর বলে স্বীকৃত তা সে পরিমিত হোক বা বেশি।   

উপরোক্ত আলোচনা থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, বিশ্বশান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য সর্বস্তরে মাদক পরিহার করতে হবে।মদ্যপানের বিরুদ্ধে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু আইনি ও সামাজিক বিষয় নয়, বরং এটি ইমান ও আমলের সঙ্গে সম্পর্কিত অতীব জরুরি বিষয়।          

Leave a Comment