বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক টিপস্

Spread the love

ধৈর্য, তীব্র সাধনা, কঠোর পরিশ্রম ও তুখোড় মেধা দিয়ে শিক্ষার্থীদের অর্জন করতে হয় সাফল্যের মুকুট। সঠিক প্রস্তুতির অভাব ও কিছু ভুলের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনশেষে পরাজয় মেনে নেবে। সাফল্যের হাসি হাসবে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী। ভর্তি পরীক্ষা অনেকটা যুদ্ধের মতোই এককথায় ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধ’। তবে এ যুদ্ধে জয় পেতে হলে আপনাকে ‘আদা জল খেয়ে’ নামতে হবে। নামতে হবে বলতে পড়াশোনা করতে হবে। 

আপনি উচ্চশিক্ষার জন্য অনার্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেরিন, টেক্সটাইল ইত্যাদি বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেন। তবে প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি। না হলে ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া অনেক কঠিন। আর সিলেবাস নির্দিষ্ট নয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংকট তো আছেই। এসব কিছু বিবেচনায় আপনাকে সঠিক প্রস্তুতি নিতেই হবে। শেষ সময়ের প্রস্তুতি ও কিছু প্রচলিত ভুল নিয়েই আজকের লেখা-

প্রস্তুতির জন্য পড়ার বিষয়: বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সাধারণ জ্ঞানসহ পদার্থ, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান ভালোভাবে পড়তে হবে। এইচএসসির সিলেবাস অনুযায়ীই নয়, বরং খুঁটিনাটি সবই পড়তে হবে।

মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, আইসিটি ও গণিত বিষয়ে ভালোভাবে পড়তে হবে। হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় নীতি বিষয়েও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়তে হবে। 

যা জানা জরুরি: ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ইউনিট-ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা হয়। তবে ভর্তি পরীক্ষা যেভাবেই হোক না কেন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি মোটামুটি একই। বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

এই স্বপ্ন ছোঁয়ার জন্য যথাক্রমে মেডিকেল কলেজ আর ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে চান্স পাওয়াটা হলো প্রথম সোপান। ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ, যা তাদের এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে অনেকটা সহায়তা করবে।

১। কলেজ জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি

তোমরা যারা এবার উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছো, তারা এখন থেকেই শুরু করে দিতে পারো বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। এতে করে তোমার নিজের পড়ার প্রতি মনোযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি কমবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময় বিশাল পরিমান সিলেবাসের বোঝা। সুতরাং যারা এইচএসসি পরবর্তী সময়ে সারাদিন পড়ে পড়ে পাগল হয়ে যাবার ভয়ে এখন থেকেই তটস্থ, তারা কিন্তু খুব সহজেই কিছু পরিকল্পনা মাথায় রেখে সামনে এগোতে পারো। এতে করে যা হবে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়  অন্য সবার মত তোমার আর এত টেনশন থাকবেনা। তখন শুধু নিজের প্রস্তুতিকে ঝালাই করতে থাকলেই তুমি ভর্তিযুদ্ধের জন্য হয়ে যাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক যোদ্ধা।

২। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার গুরুত্ব বুঝা

শৈশব থেকে লালিত কোনো পেশাজড়িত স্বপ্ন প্রায় সম্পূর্ণই নির্ভর করে এই পরীক্ষার উপর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নের কথা। অনেকেই মনে করে, “সামান্য একটা পরীক্ষাই তো। জীবনে কত পরীক্ষা দিলাম! এ আর নতুন কী!” আর এই চিন্তাটাই হলো হোচট খাওয়ার প্রথম কারণ। জীবনে তুমি অসংখ্য পরীক্ষা দিয়ে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাটা আলাদা করে দেখতেই হবে; নিতে হবে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে।

৩. ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শুরুতেই মুখস্তকে জানাও বিদায়

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি নাম শোনার সাথে সাথে তোমার প্রথম কাজ হলো – মুখস্থ শব্দটাকেই তোমার মনের ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলা। মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিকে কোন ভাবে একটা না একটা বিষয় মুখস্থ করে তুমি হয়তো পরীক্ষায় লিখে দিয়ে নাম্বার পেয়ে গেছো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি থেকে শুরু করে একদম শেষদিন পর্যন্ত বুঝে বুঝে পড়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাই কলেজে কোন টপিক বা প্রশ্ন মুখস্থ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য সেটি এক্ষুনি বুঝে নেয়াটা একান্ত কর্তব্যের মাঝে পড়ে যায়। মুখস্থ কে যত তাড়াতাড়ি টাটা বায় বায় বলছো ততই তোমার মঙ্গল। সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে মুলত শিক্ষা থেকে মুখস্থ শব্দটা কে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য। সুতরাং মুখস্থে কে করো বিদায়, বুঝে পড়া কে বলো Hi!  

ক্যারিয়ার গঠনে কি কি গুণ ও দক্ষতা প্রয়োজন জানতেভিজিট করুন

৪. অনুশীলন এবং অনুশীলন

এ সময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন প্রচুর অনুশীলন। যে যত বেশি অনুশীলন করবে, সে তত বেশি এগিয়ে থাকবে। তবে অনুশীলনের সময় একটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি-একই টপিক বা বিষয় যেন বারবার রিভিশন দেওয়া না হয়। যেমন- একই নিয়মের দশটি অঙ্ক সমাধান করার চেয়ে দশ নিয়মের একটি করে অঙ্ক সমাধান করা বেশি কার্যকরী। এতে করে অল্প সময়ে অনেক রিভিশন দেওয়া যায়। সব টপিক ও বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। যে বিষয় বা টপিকে দুর্বল, সেটি আগে অনুশীলন করা উচিত।

৫. লক্ষ্যকে বাড়তি সময় দাও

তুমি যদি উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী হয়ে থাকো তবে তোমার প্রতিনিয়তই প্রত্যেকটি বিষয়কে প্রায় সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হয়। কারণ, এইচএসসিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেতে সব বিষয়ে ভালো করার বিকল্প নেই। এজন্য কোন বিষয়কেই ছোট করে দেখা উচিত নয়। তাছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা এইচএসসির রেজাল্টের পরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে বিষয়টাকে তুমি সহজ বা অন্যগুলোর তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছিলে সেই বিষয়টিতেই তোমার ফলাফল খারাপ হয়েছে। অথবা উচ্চতর গণিত, রসায়ন  কিংবা ইংরেজির মত বিষয়গুলোতে তুমি ঠিকই ভালো করেছো কিন্তু বাংলা কিংবা সমাজবিজ্ঞান বিষয়কে তুমি সহজ ভেবে তেমন গুরুত্ব দাওনি, তাই নাম্বার ভালো পাওনি।

যেহেতু মেডিকেলে ভর্তি হওয়াটা তোমার লক্ষ্য, সুতরাং সেখানে ভর্তি হতে হলে ভর্তি পরীক্ষায় যেসব বিষয়ের উপর প্রশ্ন থাকে সেসব বিষয়কে তোমার এখন থেকেই বেশি প্রাধান্য দিতে হবে। তুমি তোমার চেনা কোন মেডিকেলে পড়ুয়া ভাইয়া/ আপু কিংবা খুব সহজেই গুগল মামার সাহায্যে তোমার কাঙ্ক্ষিত তথ্য নিয়ে সে বিষয়ের উপর অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করতে পারো আগেভাগে ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতি হিসেবে।

৬. সময় ব্যবস্থাপনা জরুরি

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে অনেক রণকৌশল শিখতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনা তার মধ্যে অন্যতম। কীভাবে কম সময়ের মধ্যে উত্তর করা যায়, তার জন্য প্রয়োজন প্রচুর অনুশীলন। এর জন্য শর্টকাট টেকনিকসহ আরও বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনে বাড়িতে বসে সময় দেখে দেখে পরীক্ষা দিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট টাইম সেট করে নিজেকে যাচাই করতে হবে। সময় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাদ পড়ে যায়।

৭. ভর্তি পরীক্ষারফাঁদগুলোকে এড়িয়ে চলো

‘পাশ না করলে মূল্য ফেরত’ অথবা ‘চান্স পাওয়ার পর টাকা’ এই কথাগুলো ঢাকায় থেকেছে আর কখনোই দেখেনি এমন শিক্ষার্থী পাওয়া দুস্কর। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি এর মৌসুম শুরু হবার আগেই ফার্মগেট কিংবা মতিঝিল সহ রাজধানীর বিশেষ বিশেষ এলাকায় এসব পোস্টার ছেয়ে যায়। লোভনীয় সব কথাবার্তা আর একদম চান্স পাওয়ার ১০০% নিশ্চয়তা দিয়ে ছাপানো পোস্টার বা কোচিং এর বিজ্ঞাপনগুলো যে একটাও তোমার কাজে আসবেনা, তা মনের মধ্যে ভালো করে গেঁথে রাখা দরকার। কেননা পড়াটা তোমার নিজের মাঝে। বাকিটা শিক্ষক ধরিয়ে দেন। সেখানে চান্স না পেলে মূল্য ফেরত কিংবা শতাধিক পাশের নিশ্চয়তা বলে আসলে কিছু নেই। 

৮. গ্যাজেট থেকে সাবধান

এ সময় সব ধরনের গ্যাজেট থেকে নিজেকে দূরে রাখা উচিত। কারণ প্রতিটি মুহূর্ত অনেক মূল্যবান। অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। তবে প্রতিদিন আপডেট থাকতে হবে। প্রতিদিন একবার হলেও গণমাধ্যমগুলোর শিরোনাম পড়া উচিত।

৯.  ভর্তি পরীক্ষার ঠিক আগে অবশ্যই যা মাথায় রাখবে!

এবার আসা যাক ভর্তি পরীক্ষার সময়ের ব্যাপারে। এই সময়টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বুঝেশুনে পা ফেলতে হয়। আমার কাছে এই সময়কে স্নায়ুযুদ্ধের সময় লাগে। যে যতক্ষণ পর্যন্ত নার্ভ ঠিক রাখতে পারবে সেই তত বেশি সফল। তবে আমরা অনেকেই তীরে এসে তরী ডুবিয়ে ফেলি। ৩/৪ মাসের পরিশ্রম একদিনেই শেষ! বলো তো আমরা কিভাবে সেটা করি? পরীক্ষার হলে! হ্যাঁ, ঠিক তাই।   

আমাদের তিন চারমাস ধরে যুদ্ধের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা করে কি লাভ যদি আমরা যুদ্ধের দিনই সেগুলো কাজে লাগাতে না পারি? তাই শুধু প্রস্তুতি নিলেই হবে না, তা সঠিক সময়ে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে তবেই যুদ্ধের জয়ী হতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা যুদ্ধের আগের দিন! সব প্রস্তুতি শেষ করে এবার রণক্ষেত্রে নামবার পালা! তাই ভর্তি পরীক্ষা এর আগের দিনটি হওয়া চাই নির্ঝঞ্ঝাট। কোনোরকম ঝামেলায় জড়ানো যাবে না, কোনো ঝামেলা লাগানোও যাবেনা। ভর্তি পরীক্ষা এর আগের দিনে যা যা করা উচিত, যা যা উচিত নয় তা বলছি । 

১) পরিমাণমত স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া করা  

২) ভর্তি পরীক্ষা অ্যাডমিট কার্ডের প্রিন্ট রেডি রাখা

৩) শান্ত থাকা 

৪) নতুন টপিক না ধরা

৫) পর্যাপ্ত ঘুম এবং কম পড়া  

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ টিপস্ বিস্তরিত জানতে–  ভিজিট করুন 

শেষ কথা, আমার মতো এত এত ভুল করা মানুষ খুব বেশি সাজেশন দিতে পারছে না তোমাদের। তবে আশা করি, এই কথাগুলো একটু কষ্ট করে মেনে চললে ভালো রেজাল্ট পাবে। আরেকটা বোনাস সাজেশন হলো ঘাবড়ে না যাওয়া। ভর্তি পরীক্ষা এর দিন শেষমুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ দেখবে, অনেককেই দেখবে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজিয়ে পড়েই যাচ্ছে তো যাচ্ছে! তুমি ভয় পেয়ো না। আস্থা রাখো নিজের প্রতি। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবেই।

Leave a Comment