ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নেটওয়ার্কিং এর গুরুত্ব

সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকতে হয়, একে অপরের সাহায্যে চলতে হয়। কারন আমরা মানুষ, একা বাঁচতে পারিনা। তাই যেমনি আমাদের জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই নেটওয়ার্কিং এর গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি কর্মজীবনেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।

ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নেটওয়ার্কিং এর গুরুত্ব জানার আগে আমাদের জানতে হবে নেটওয়ার্কিং মুলত কি। তাই নেটওয়ার্কিং এর সংগা দিয়েই শুরু করছি আজকের এই লেখা। ফলে নেটওয়ার্ক কি এবং ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বুঝতে আশা করি এই আর্টিকেলটিই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

নেটওয়ার্কিং

একে অপরকে জানাটাই মুলত নেটওয়ার্কিং। অর্থাৎ নেটওয়ার্কিং হল এমন এক দক্ষতা যা আমাদের একে অপরের সাথে বা বিভিন্ন রকম মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে বা সম্পর্ক গড়তে সহযোগিতা করে। অন্যান্য দক্ষতার মত নেটওয়ার্কিংও এক প্রকার দক্ষতা। এই দক্ষতা আমাদেরকে বিভিন্ন মানুষের সাথে সম্পর্কের উন্নতি করতে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। একইসাথে আমাদের প্রয়োজনের সময় সামনে দাড় করিয়ে দেয় এমন অনেক মানুষকে যাদের থেকে সাহায্য নেয়া যায়।

চলুন জেনে নেই ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কিং এর কী কী গুরুত্ব রয়েছে

চলুন জেনে নেই ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কিং এর কী কী গুরুত্ব রয়েছে

কোন চাকরী পাওয়ার ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কোম্পানি বিভিন্ন সময় কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞাপন না দিয়ে পরিচিত মহল থেকেই দক্ষ লোকদের সাথে যোগাযোগ করে এবং চাকরী দেয়। তাই যোগ্য ও সঠিক মানুষদের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতে পারলে চাকরী পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।

কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় এমন অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় যেগুলোর সমাধান কোন বই থেকে পাওয়া যায়না। প্রয়োজন হয় অভিজ্ঞতার। একেক জনের অভিজ্ঞতা একেক রকম। নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে নানা রকম মানুষের সাথে যুক্ত থাকার ফলে সমস্যার সমাধান সহজেই পাওয়া সম্ভব হয়।

কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সাহায্য সহযোগীতা পেতে নেটওয়ার্কিং এর তুলনা হয়না। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন কম -বেশি আমাদের সবারই হতে হয়। যে বিষয়টা আপনার জন্য খুবই কঠিন, হতে পারে সেই একই বিষয় অন্যের কাছে পানির মত সহজ। তাই সহকর্মীদের সহযোগিতা পেতে তাদের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখা চাই।

চাকরি জীবনে অনেক সময় সহকর্মীদের পরামর্শ, আইডিয়া এবং অভিজ্ঞতার দরকার হয়। নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে তাদের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতে পারলে সহজেই সহযোগীতা পাওয়া যায়, আবার অনেক সময় নিজেও তাদের সমস্যায় সহযোগীতা করা যায়।  এতে সাহায্য- সহযোগীতা আদান প্রদানের ফলে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। ফলে চাকরিতে দ্রুত প্রমোশন ও নানা ধরনের সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়।

আপনি যদি ব্যবসায়ী হন তাহলে আপনার বিভিন্ন মানুষের সাথে সম্পর্ক ভাল রাখতে হবে। নিজেকে পরিচিত করাতে হবে মানুষের সামনে। আমরা স্বভাবতই অচেনা অজানা কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারিনা। ফলে তাদের সাথে সহজে ক্রয়- বিক্রয়ও করতে চাইনা। যখন আপনাকে মানুষ ভালভাবে চিনবে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে তখন মানুষ আপনার কাছেই ক্রয় বিক্রয় করতে চাইবে। তাই নিজেকে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে নেটওয়ার্কিং বাড়িয়ে তুলুন।

নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে আকাঙ্খিত কোন চাকরি বা এমন কোন ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়ে যেতে পারে যার মাধ্যমেই জীবনের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুড়ে যেতে পারে। সুতরাং ক্যারিয়ার গড়ার নতুন সম্ভাবনার দ্বার যেকোন সময় খুলে যেতে পারে নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে। তাই যোগ্য ব্যক্তিদের সাথে যুক্ত থাকুন।

যখন আমরা অন্য মানুষদের সাথে উঠাবসা করিনা, তখন  আমাদের একাকীত্ব ফিল হয়, আর এই একাকীত্ব থেকেই জীবনের বেশীরভাগ ক্লান্তি, অবসাদ, দুঃচিন্তাগুলো এসে থাকে। ফলে আমরা কর্মজীবনেও মানুষিক শান্তি পাইনা, কাজ করার উদ্যম হারিয়ে ফেলি, ভাল ক্যারিয়ার গঠন করতে পারিনা। নেটওয়ার্কিং বাড়াতে পারলে এ সমস্যার সমাধান পাওয়া সম্ভব।

আমাদের কর্মক্ষেত্রে নানা শ্রেণির মানুষ রয়েছে। একেক জনের দক্ষতা একেক রকম। প্রত্যেকের ভুমিকাও আলাদা আলাদা। নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে তাদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ এবং ভাল সম্পর্ক তৈরী করতে পারলে পরষ্পরের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী হবে। যা আপনাকে ভাল কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। এই দক্ষতা একটি ভাল এবং বাড়ন্ত  ক্যারিয়ার গঠনে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ।

নেটওয়ার্কিং ক্যারিয়ার গঠনের নতুন সুযোগ তৈরী করে। নেটওয়ার্কিং যতবেশী বাড়ানো যাবে তত বেশী মানুষের সামনে নিজের আচার আচরন, কথাবার্তা এবং তথ্য- আইডিয়া আদান প্রদানের দ্বারা নিজেকে আকর্ষণীয় এবং কর্মক্ষম উপকারী মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। তাই নেটওয়ার্কিং বাড়ান, বেশী বেশী মানুষের সাথে মিশুন।

অনেক সময় আমাদের চাকরীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন রেফারেন্সের দরকার পড়ে, ক্যারিয়ার গঠনে এই রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। যোগ্য লোকেরা তখনই রেফারেন্স হিসেবে আমাদের উপকারে আসে যখন তারা আমাদেরকে ভালভাবে চিনে, আমাদেরকে পছন্দ করে।

একটা কাজে বা চাকরীর একটা পদে কাজের যোগ্যতা অনেকেরই থাকে, কিন্তু সবাই চাকরী পায়না। যারা যোগাযোগের নেটওয়ার্কিং এ এগিয়ে থাকে কেবল তারাই চাকরির সেরিয়ালে প্রায়োরিটি পায়। তাই নেটওয়ার্কিং জুরালো এবং জীবন্ত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

যোগাযোগের নেটওয়ার্কিং তৈরীতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা হল- ফোন বা  মেসেজিং এর মাধ্যমে যথাসম্ভব খোঁজ খবর নেয়া, পুরোনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের পাশাপাশি নতুন বন্ধু তৈরী করা, ক্যারিয়ার নেটওয়ার্কিং কর্মসূচী গুলোতে বেশী বেশী অংশগ্রহণ করা, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যদেরকে সাহায্য সহযোগীতা করা, নিজের আইডিয়া বা মতামত অন্যদের সাথে ব্যক্ত করা, অভিজ্ঞতা শেয়ার বা আদান প্রদান করা।

নিজেকে মানুষের সামনে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতে অন্যের কথা শুনুন, কেননা শুনার পরেই আপনার বলার সুযোগ আসবে। আমরা স্বভাবতই বলতে পছন্দ করি, নিজেরা অন্যদেরকে না শুনলে অন্যরাও আমাদের কথা শুনতে চাইবে না।

প্রাসঙ্গিক কথা বলুন, টপিকের বাইরে না গিয়ে টপিকের সাথে রিলেটেড এমন কৌতুক বা হাস্যরসাত্মক উদাহরণ টেনে কথোপকথন করুন। কথার মাঝখানে হুটহাট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না করে সুন্দরভাবে আলোচনার ইতি টানুন এবং সময় করে পুনরায় যোগাযোগ করুন।

নেটওয়ার্কিং দুই ধরনের হতে পারে। একটি হল অফলাইন নেটওয়ার্কিং, আরেকটি অনলাইন নেটওয়ার্কিং। অফলাইন নেটওয়ার্কিং এর ক্ষেত্রে স্বশরীরে বা বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ রাখা উচিত।

ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে অনলাইন নেটওয়ার্কিং এর অবদান অনেক বেশী। নেটওয়ার্কিং এর মধ্যে অনলাইন নেটওয়ার্কিং অন্যতম। তাই আপনার উচিত অনলাইন প্রফাইলটি উন্নত করা এবং প্রফেশনাল লুক দেয় এমনভাবে তৈরী করা যাতে অনলাইন নেটওয়ার্কিং এর ক্ষেত্রে আপনাকে কোনরকম অসুবিধার সম্মুখীন হতে না হয়।

শেষকথায়

সর্বোপরি আমাদের ক্যারিয়ারে উন্নতি করা বা পিছিয়ে পড়ার কারন এই নেটওয়ার্কিং। আমরা অনেক সময় যোগাযোগ রাখতে অবহেলা করি। এতে নতুন মানুষদের সাথে সম্পর্ক হওয়া তো দুরের কথা যাদের সাথে নেটওয়ার্কিং তৈরী হয়েছে তাদের সাথেও সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্যারিয়ার গড়ার যে সম্ভাবনাময় সুযোগটা তৈরী হতে পারত সেই সুযোগটা অন্যজনের কাছে চলে যায়। যোগাযোগের নেটওয়ার্কিং ভাল থাকার ফলে অন্যজন সেই পদ দখল করে নেয়। তাই আমাদের যোগাযোগ রাখা উচিত। যাদের সাথে নেটওয়ার্কিং তৈরী হয়েছে তাদের ভাল মন্দ খোঁজ খবর নেয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন বন্ধু তৈরী করা উচিত। কেননা নেটওয়ার্কিং বাড়াতে পারলে দ্রুত পদোন্নতি সম্ভব। ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নেটওয়ার্কিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Leave a Comment