কম বেতনের চাকরি থেকে উচ্চ বেতনে উন্নতি

বর্তমানে আমাদের যুবক সমাজ থেকে শুরু করে চাকরির বয়স শেষ হওয়া পর্যন্ত সকলেরই  চাকরি পাওয়ার সময় একটি বিষয়ই প্রাধান্য পায় তা হলো “বেতন” । 

অনেক সময় মানুষ নিজের পছন্দের কাজ পেয়েও কাজটিকে গুরুত্ত দেয় না, চাকরিটি করতে চায় না  শুধুমাত্র নিম্ন বেতনের জন্য। কিন্ত মানুষ একটা জিনিস কখনোই বুঝতে চায়না, যে বিষয়ে তার দক্ষতা রয়েছে, সে বিষয়ে শ্রম দিলে সে অবশ্যই ভালো করবে । তাই চাকরি নিম্ন বেতনের হলেও অবশ্যই কাজটিকে দৃঢ় মনোযোগ, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করলে উচ্চ বেতনে উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে ।   

পদোন্নতি বা পদোন্নয়ন হলো কর্মীকে তার বর্তমানে থাকা পদ হতে উচ্চতর দায়িত্ব ও পদমর্যাদা সম্পন্ন পদে উন্নীত করা । প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই পদোন্নয়ন কর্মীদের উত্তম কাজের পুরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয় । এতে কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীদের প্রতিষ্ঠান ধরে রাখতে পারে এতে প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষন্ন থাকে । 

বাংলাদেশে এমন চাকরি রয়েছে যেখানে শুরুতে বেতন অনেক কম থাকলেও পদোন্নতির অনেক সুযোগ থাকে এবং কম সময়ের মধ্যেই উচ্চ বেতনে পৌছানো যায় । যেমন- প্রশাসন, পুলিশ, বেসরকারি চাকরি বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের চাকরি । এসব ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের মধ্যে পদোন্নতি দেখা যায় । 

এখন সকলের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে পদোন্নতিতো হয় বুঝলাম কিন্তু কি করলে পদোন্নতি হয়ে থাকে? পদোন্নতি হওয়ার জন্য কি শুধু চাকরির বয়স অর্থাৎ কতদিন চাকরি করেছি সেটাই জরুরি ? কিছু কিছু চাকরি বিশেষ করে সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে চাকরি কালের ওপর নির্ভর করেই পদোন্নতি ।

চাকরিতে পদোন্নতি পাওয়া সব কর্মজীবীরই চাওয়া থাকে । কিন্তু চাইলেই দ্রুত পদোন্নতি পাওয়া যায় না, এর জন্য সঠিক উপায়ে চাকরি করতে হয় । কর্মক্ষেত্রে যদি আপনি আপনার পদোন্নতি চান তাহলে এখন থেকেই আপনার দক্ষতা, যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতার বাইরে চিন্তা- ভাবনা শুরু করুন ।  

আজকে আমরা আলোচনা করবো কিভাবে কম বেতনের চাকরি থেকে উচ্চ বেতনে উন্নত হওয়া যায়  :  

আত্মনির্ভরশীলতা  

নিজের কাজ নিয়ে গর্বিত থাকবেন । যখন আপনি খুশিমনে কাজ করবেন, তখন আপনার কাছে আপনার কাজ আর বোঝা মনে হবে না । সততার সঙ্গে কাজ করুন, সবার আস্থার মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরুন । নিজেকে একমাত্র যোগ্য দাবিদার, কথায় নয়, কাজেই প্রমাণ করে দিন । 

বসের সঙ্গে চাটুকারিতা করা মানে ক্যারিয়ারে ওপরে ওঠার উপায় এই ধারণা ভুল । বরং আপনি আপনার বসের কাজ সহজ করে দিন । বস যেভাবে চাচ্ছেন সেভাবে কাজ করুন । বসকে সাহায্য করুন । আই কন্ট্যাক্ট মেইনটেইন করে  বা চোখে চোখ রেখে কথা বলুন ।  

শরীরী ভাষা 

কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে মানুষ আপনার কথা কতটা পছন্দ করবেন, এর মাত্র ৭ শতাংশ নির্ভর করে আপনি কী বলছেন, তার ওপর । ৩৮ শতাংশ নির্ভর করে আপনার কথা বলার ধরন ও মুখের অভিব্যক্তির ওপর । আর সিংহভাগ, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ নির্ভর করে আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষার ওপর । তাই কী বলছেন, সেটা তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরী ভাষা ।   

সুসম্পরক ও কাজের ফলাফল দেখানো 

বর্তমানে বেশিরভাগ পদোন্নতি নির্ভর করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর । যেমন ঠিকমত কাজ করা, অফিসের চাহিদা মতো ইনপুট আউটপুট প্রদান করা ও নিত্য নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে অবশ্যই ভূমিকা রাখা । একইভাবে অন্য সহকর্মীদের জন্যও সাহায্যের মানসিকতা ও সুসম্পর্ক রাখলে চাকরিতে সফলতা লাভ করা যায় । অফিসে কাজের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখালে পদোন্নতি পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় । এর মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বস্ত থাকা যায় ।  

অনেক সময় বিভিন্ন আড্ডা কিংবা সেমিনারে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তাদের খুব কাছে আসা যায় এতেও সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয় । মাঝেমধ্যে প্রশংসা করুন । হয়তো বসকে দেখে বললেন, ‘ আপনার এই শাড়িটা বা শার্টটা তো খুব সুন্দর ’ বা ‘ এই হেয়ার কাটে আপনাকে বেশ মানিয়েছে ’ অথবা বলতে পারেন, ‘ ইনস্টাগ্রামে আপনার পোস্ট করা ট্যুরের ছবিগুলো দেখেই জায়গাটায় যেতে ইচ্ছা করছে । ’ তাতে তিনি বুঝবেন যে আপনি তাঁকে লক্ষ করেন ও গুরুত্ব দেন । নিজের সৃজনশীলতার মাধ্যমে অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের কাছে সেলফ ব্র্যান্ডিং করা যায় ।    

নতুন কাজের দক্ষতা 

চাকরির বাজারে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে কাজের চাহিদাও । যার দক্ষতা বেশি, তার দ্রুত পদোন্নতি হয় । আপনি কি অরডিনারি নাকি এক্সট্রা- অরডিনারি তা বোঝা যাবে আপনি কতটুকু এক্সট্রা কাজ করছেন তা থেকে ।  তাই নতুন নতুন কাজ শিখুন এবং নিজেকে আপনার প্রতিষ্ঠানের একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে প্রমাণ করুন।

দলগত কাজে অংশ নেওয়া 

কোনো কাজের সফলতা একা আনা সম্ভব না । দলীয় চেষ্টার মাধ্যমেই সাফল্য অর্জিত হয় ।  যে কোনও দলগত কাজে অংশ নিলে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেয়া যায়, কাজের দক্ষতাও বাড়ে ।

সহকর্মীদের সঙ্গে হৃদ্যতা রাখা যায় । নিজের কাজগুলো সময় মতো শেষ করুন । সেই সঙ্গে পাশের কলিগকে তার কাজে সহযোগিতা করুন । মনে রাখবেন, অপরকে সাহায্য করলে নিজের গুরুত্ব বাড়ে । অনেক সময় দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে পদোন্নতি অর্জন করা যায় ।   

অহংকারী নয়, নম্র হন

যারা অহংকারী হয় তারা ভাবেন যে তারাই সব কিছু জানেন, কিন্তু নম্ররা প্রতিনিয়ত কর্মক্ষেত্রে নতুন কিছু শিখেন । নম্র ব্যক্তিরা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, জানতে চান, কোনো কিছু না পারলে তারা অন্যের সহযোগিতাও চেয়ে থাকেন । নম্র ব্যক্তিরা সফলতার প্রশংসা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন । কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে, সাফল্য তখনি আসবে যখন আপনি কত উপরে যেতে পারবেন তা না ভেবে কতটা নিচে নেমে কাজ করতে পারবেন, সেটি ভাবতে পারবেন ।

পরিবর্তনকে মেনে নিতে হবে

যেসকল প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বা লাভের পরিমাণ বেশি থাকে সেসকল প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত নানাবিধ পরিবর্তন ঘটে থাকে । যারা অধৈর্য তারা এই পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারেনা । ফলে সচেতন বা অবচেতনভাবে তারা ধীরে ধীরে আশেপাশের কাজগুলোর গতি কমিয়ে দেয় । সফল চর্চা গুরুত্বপূর্ণ । কাজ সম্পাদনের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ । নির্দেশিকা, পদ্ধতি, নীতি এসবই কোনো ব্যবসাকে সফলভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে । 

সফল কর্মীরা পরিবর্তনের ব্যাপারে আগ্রহী থাকে এবং প্রবল ইচ্ছা পোষণ করে । সফল কর্মীরা  নতুন যেকোনো পরিস্থিতিকে সহজেই মেনে নেয় । মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তারা কোনো প্রকার দ্বিধা- দ্বন্দ্বে থাকেনা । যেসকল প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার গতি বেশি তাদের এমন কর্মী প্রয়োজন যারা যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে এবং সামনে এগিয়ে যাবে ।

পদোন্নতি প্রাপ্তদের  অনুসরণ করুন

প্রায় সব অফিসে সবাই একসঙ্গে পদোন্নতি পায় না । কয়েক বছরে আপনার অফিসে যারা পদোন্নতি পেয়েছেন তাদের অনুসরণ করুন । তারা কেন পদোন্নতি পেয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করুন । সাধারণ- ব্যক্তিত্ব, চরিত্র বা দায়িত্বের মধ্যে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করুন । তারপর নিজের মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করুন ।  

অফিসের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করুন 

প্রায় সব অফিসেই কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে । কোম্পানির উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করা সমস্যা চিহ্নিত করুন এবং সমাধান খুঁজুন । আপনার কাজ আপনাকে প্রচারে এগিয়ে রাখবে । অফিসে আপনার ইতিবাচক উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ যারা কাজের চাপের মুখে শান্ত এবং ইতিবাচক, তারা যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারে ।আপনি অন্য লোকেদের প্রতি যে সহায়তা প্রদান করেন তার সাথে আপনাকে আরও বৈষম্যমূলক হতে হবে । এতে করে ভুল হওয়ার আশঙ্কা যেমন কমবে, তেমনি অফিসে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে । ফলে আপনি পদোন্নতি পেতে পারেন ।    

পরনিন্দা ত্যাগ করা  

অফিসে পরনিন্দা করবেন না, একজনের দোষ আরেকজনকে বলবেন না । তাহলে, উভয় ক্ষেত্রেই আস্থা হারাবেন । বরং, সবাইকে সম্মান করবেন, কাজের প্রশংসা করবেন । কেউ ভুল করলে গোপনে ভুল ধরে দেবেন । আর যেটি মোটেও করবেন না, সেটি হলো ‘ গসিপিং ’! কিন্তু অবশ্যই সর্বদা অতিরিক্ত অর্থপ্রাপ্তির আশা রাখা বা নিজের দক্ষতা না বাড়িয়ে সবসময় কর্মকর্তাকে খুশি করে পদোন্নতির চিন্তা করা মোটেও ঠিক না ।   

অবশেষে আপনি অন্য লোকেদের প্রতি যে সহায়তা প্রদান করেন তার সাথে আপনাকে আরও বৈষম্যমূলক হতে হবে । হয়তো আপনি এমন পরিস্থিতিতে আছেন । এই ক্ষেত্রে, আপনি যদি হতাশ হন । আপনাকে ক্রমাগত নিজেকে উদ্দীপিত করতে হবে । প্রতিদিন কাজের মাধ্যমে আপনার হতাশা দূর করতে হবে । 

মানুষের সফলতার মূল কারণ কখনো হার না মানা এবং কাজটির সাথে লেগে থাকা । তাই প্রতিটি কাজের মাঝে সম্ভাবনা খুজে বের করুন এবং নিজেকে নিজের পছন্দের কাজে দক্ষ করে তুলুন। তবেই কেবল সফলতা সম্ভব।

তাই বলা যায় কেউ যদি নিম্ন বেতনের চাকরি হওয়া সত্ত্বেও কাজটির প্রতি তার আগ্রহ থাকে এবং সে কাজটি নিয়ে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার দৃঢ়মনোবল রাখে, অবশ্যই সে একদিন ঐ বিষয়ে দক্ষ হবে এবং উচ্চ বেতনেও নিয়োগপ্রাপ্ত হবে ইনশাআল্লাহ । 

Leave a Comment