কঠিন সময়ে ক্যারিয়ারের লক্ষ্যে অটুট থাকা

সংঘবদ্ধ মানব জীবনে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্যারিয়ার। সকল মানুষের প্রয়োজন বা অভাব রয়েছে। এই প্রয়োজন বা অভাব পূরণ করার জন্য মানুষ কোন না কোন কাজকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেয়। সামষ্টিক প্রচেষ্টা যেখানে বিদ্যমান, ক্যারিয়ারের অস্তিত্ব উপস্থিতি সেখানে অবধারিত। সামষ্টিক প্রচেষ্টার মূলে যে লক্ষ্য থাকে এবং সে লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য নানাবিধ কাজের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়, যা ক্যারিয়ার নামেই পরিচিত। সুতরাং জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে মানুষ যে কাজ গ্রহণ করে তাকে জীবনোপায় বা ক্যারিয়ার বলে। 

ক্যারিয়ার কি

“CAREER” শব্দটি ল্যাটিন শব্দ “CARRUS” শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ হলো কামরা। অর্থাৎ মানুষ যেমন একটি কামরাতে আশ্রয় গ্রহণ করে, তেমনি আর্থিক একটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে। ক্যারিয়ার হচ্ছে জীবন উপকরণের একটি উপায়, একটি অগ্রগতি, কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্র, কিংবা কাজের ক্রমধারা। অর্থাৎ সব ধরনের কাজ, পেশা, চাকরি বা জীবন অভিজ্ঞতার সমন্বিত রূপ-ই হলে ক্যারিয়ার, যা একজন ব্যাক্তি সারা জীবনে অর্জন করে থাকে। সুতরাং জীবনে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গঠন এবং এর যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনই হলো ক্যারিয়ার।

জীবনের লক্ষ্য ও অবস্থান

আমরা প্রত্যেকেই আগামী দিনের একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি পরিপূর্ণ সুন্দর একটি সমাজ বিনির্মাণের। স্বপ্ন দেখি ভালো কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করার। স্বপ্ন দেখি দক্ষতা ও যোগ্যতার আলোকে ভারসাম্যপূর্ণ ক্যারিয়ার গঠনের। এরপরও অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঝড় পুরোদমে বিকল দেয় একটু একটু করে তিলে তিলে গড়ে তোলা লালিত স্বপ্নকে। 

সমাজে কেউ শিক্ষিত, কেউ অশিক্ষত, আবার কেউ বা বেকার। তাদের প্রত্যেকের জীবন প্রণালী যেমন ভিন্ন, চিন্তার জগৎও ভিন্ন। নানা বিভ্রান্তি, সমস্যা ও অন্ধকারে জর্জড়িত তাদের জীবন। অবস্থা এমন যে, সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা সবসময় শংকিত। প্রতিনিয়তই মুষড়ে যাওয়া জীবনের বাঁকে বাঁকে লেগে থাকে সংগ্রামী মানব প্রাণটি। অল্প সময়ে মুছে যায় তাদের যৌবনের রং। জড়ো হয় অবিশ্রান্ত আঘাত, লক্ষ দীর্ঘশ্বাস ও থরো থরো বেদনা। কখনো লজ্জিত, কখনো আনন্দিত, কখনো ভীত, কখনো সাহসিকতা, কখনো আশা, আবার কখনো চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে জীবনের সাথে লড়াই করতে থাকে।

এমন কঠিন মুহুর্তে নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা ভিত্তিক কাজ, বৃত্তিমূলক কাজ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। কোন কাজই ছোট বা অসম্মানজনক নয়। ক্যারিয়ার গঠন নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। ক্যারিয়ার বলতে আমরা অনেকেই মনে করি বড় কোনো অফিসার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া। কিন্তু ক্যারিয়ার একটি অর্জনযোগ্য স্তরের নাম মাত্র। ক্যারিয়ারের সংজ্ঞা থেকে আমরা তাই বুঝি যা কোনো পেশায় চুড়ান্ত লক্ষ্যে সফলভাবে পৌঁছানো যায়। 

সুযোগ ও প্রাপ্তি

তথ্য প্রযুক্তির যুগে পৃথিবী আজ হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞানের অভাবনীয় কল্যানে পৃথিবী ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির উৎকর্ষেই মানুষ অজানাকে জানার, বাঁধাকে দূর করার, নতুনকে পাবার এবং রহস্য উন্মেচনের বিজয় নেশা সমাজ-সংস্কৃতিতে পার্থক্য সৃষ্টি করে। যে সমাজ ব্যবস্থা যত বেশি জ্ঞানে, কর্মে, ধর্মে, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অগ্রসরমান সে জাতির উন্নতিও তত বেশি। জীবন প্রসারের বিভিন্ন পর্যায়ে মানব জীবন সংক্ষিপ্ত হলেও ক্যারিয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী দিকনির্দেশনা এবং অত্যন্ত গভীর গুরুত্বপূর্ণ সময়।

ক্যারিয়ার শুধু উচ্চতর কোন চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি হতে পারে ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, অবৈতনিক কাজের অভিজ্ঞতা, ইন্টার্নশিপ সহ সব ধরনের কাজের উন্নতি। এছাড়াও নেটওয়ার্কিং, পার্ট-টাইম জব, ইন্টার্নশীপ, প্রজেক্ট, ফ্রী কাস্টমার সার্ভিস, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা সোশ্যাল মনিটাইজেশন সবই ক্যারিয়ারের অংশ। শিক্ষাগত যোগ্যতায় অন্যের থেকে পিছিয়ে থেকেও কেউ সফল ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হয়ে সমাজের একজন মডেল হতে পারেন। এক্ষেত্রে সফলতাই হলো আপনার জীবনের ক্যারিয়ার।

সর্বোত্তম ধাপ

ক্যারিয়ারের সর্ব প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বা কাজটি হল লক্ষ্য নির্ধারণ করা। কিন্তু পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক  মানুষ আছেন যাঁদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে। জীবনে লক্ষ্য না থাকাটা জাতির উন্নতির পথে একটি বড় বাঁধা। লক্ষ্য নির্ধারণের প্রধানতম সুবিধা হচ্ছে, যখন ভাল সুযোগ তৈরী হয় তখন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে যাওয়া। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় পন্ডিত, সাধক, ও লেখক  স্বামী বিবেকানন্দ বলেন__–

একটি লক্ষ্য ঠিক করো। সেই লক্ষ্যকে নিজের জীবনের অংশ্ বানিয়ে ফেলো। চিন্তা করো, স্বপ্ন দেখো। তোমার মস্তিষ্ক, পেশী, রক্তনালীপুরো শরীরে সেই লক্ষ্যকে ছড়িয়ে দাও, আর বাকি সবকিছু ভুলে যাও। এটাই সাফল্যের পথ।

আবার অন্যদিকে যদি সুযোগ তৈরী নাও হয়, তবে সময়, ধৈর্য্য ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে কোনো পেশায় যোগ্যতা দক্ষতাসহকারে সফলতা অর্জনই হলো ক্যারিয়ারের মূল কথা। বর্তমান ক্যারিয়ার ভাবনায় আসছে নানা মাত্রিক পরিবর্তন। প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবী। সেই সাথে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন পদ্ধতি। যার দক্ষতা যত বেশি। আগামী দিনগুলো মোকাবিলা করার সক্ষমতা তার তত বেশি। নতুনত্ব অর্জন করার সম্ভাবনাও তার তত বেশি। সুতরাং কোনো ভুল ধারণাবশতঃ কিংবা  একটি লক্ষ্য অর্জনের ব্যর্থতা নিয়ে অলস বসে থাকার কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বৃত্তে নিজেকে আটকে রেখে পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং মুহুর্তে ছোট ছোট উদ্যোগ গুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। 

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ

আপনি কি চান? 

কোন কাজটি করতে চান? 

কোন কাজটি আপনার ভালো লাগে?

তার একটি সুন্দর নক্শা প্রণয়ন করা। অথবা নিজের পছন্দনীয় কাজের নকশা প্রণয়ন করা। উক্ত কাজে মনোযোগী হওয়া। বিষয় গুলো ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া। এই তীব্র প্রতিযোগিতামুখর পৃথিবীতে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান তৈরির জন্য পেশাগত নেতৃত্ব, দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজন। নিজেকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তাই ঈর্ষনীয় ক্যারিয়ার গঠনে সমাজে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতে সকলের প্রত্যয়দীপ্ত হওয়া উচিত। কেননা, ভবিষ্যৎ বলে কিছুই নেই। তাই হতাশায় ডুবে না থেকে ছোট করে হলেও বর্তমান কর্ম পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করা।

স্ব-উন্নয়নে মনোযোগী হলে অবশ্যই ভবিষ্যত জীবনে ও কর্ম জীবনে ইতিবাচক ফলাফল আসে। কারন, এটি আপনাকে নতুন কিছু শেখাবে এবং আরও অনেক কিছু শেখার সুযোগ তৈরী করে দেবে, আপনাকে আপনার দক্ষতা এবং ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করবে এবং চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। যখনি আপনি কোন কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেবেন, তখনি এটি আপনার শখ এবং আপনার আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে।

সফল হতে হলে উপযুক্ত কর্ম, পরিকল্পনা ও রুটিন মাফিক কাজের কোন বিকল্প নেই। ক্যারিয়ার ভাবনা, লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত  ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তাই নিজ নিজ অবস্থান, যোগ্যতা, আগ্রহ ও প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয় গুলো বিবেচনায় নিয়ে কর্ম পরিচালনা করা প্রয়োজন। 

শেষকথা 

পরিশেষে বলা যায়, সমস্ত কাজই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। ক্যারিয়ার সফল্যমণ্ডিত তখনই হয় যখন আপনার আর্থিক সক্ষমতা এবং কাজের উপভোগ্যতা একসাথে মিলিত হয় এবং আপনি উপলব্ধি করেন যে আপনি আপনার জীবন এবং আপনার কাজ ও কর্মজীবন নিয়ে তৃপ্ত। আমেরিকান বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক, প্রকাশক, প্রভাষকও উদ্যোক্তা মার্ক টোয়েন বলেন__

তোমার লক্ষ্যের সাথে সম্পর্কৃত নয় তা এড়িয়ে যাও আর নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস রাখো, এই দুটোই সফলতার জন্য যথেষ্ট।

সৃজনশীল কর্মজীবনে সাফল্য আসতে একটু সময় লাগতেই পারে। তাই অনেক বাঁধা আসা সত্বেও হাল না ছেড়ে দিয়ে লক্ষ্যে অটুট থাকা। সহজ সহজ উপায়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারলে আপনি এগিয়ে যেতে পারবেন আপনার লক্ষ্য পূরণের দিকে; যা আপনাকে অনেকের মধ্যে একজন হতে সাহায্য করবে। তাই জীবনের হাল ধরতে শিখুন আজই।

নিজস্ব অভিমতঃ

মানব জীবন কর্মময়। কর্ম জীবনের স্বপ্নগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী হয় তাদেরই, যারা তাদের কাজের প্রতি যত্নবান ও সৃজনশীল। ছোটবেলা থেকে জীবনের লক্ষ্য নিয়ে নানা স্বপ্ন থাকলেও অধিকাংশ মানুষের তা বাস্তবায়ন হয় না। সুতরাং নিজের প্রতিভা, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের একটি ক্ষেত্র তৈরী করুন। সমাজে আপনার অবস্থান তৈরী করুন। যে কোনো কাজকে ভালোবাসুন। কাজকে উপভোগ করুন। কাজে সততা বজায় রাখুন। যার নতুন নতুন সব  অভিজ্ঞতা আপনার দক্ষতাকে শানিত করবে।

আপনার সুন্দর ক্যারিয়ার গঠনের সকল প্রস্তুতির সাথে অবশ্যই মহান রবের সাহায্য সহযোগিতা কামনা করুন। আপনার মূল্যবান সময়গুলোকে সম্মানজনক ও শ্রেষ্ঠ কাজে পরিণত করুন এবং সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ উপায়ে তা ব্যয় করুন। সৎকর্ম প্রতিপালকের পুরস্কার প্রাপ্তির জন্যও শ্রেষ্ঠ; প্রতিদান হিসাবেও শ্রেষ্ঠ।

Leave a Comment