হজমশক্তি বাড়ানোর উপায় কি?  

Spread the love

হজমশক্তি বা পাচনতন্ত্রের কার্যকারিতা আমাদের শারীরিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো হজমশক্তি থাকলে খাবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করা সম্ভব হয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী হয়। কিন্তু অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, বেশি চর্বি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার, মানসিক চাপ ও কম শারীরিক কার্যকলাপ হজমশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই হজমশক্তি বাড়ানো শুধু স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনে তাজা ও সজীব থাকার জন্যও অপরিহার্য। এই নিবন্ধে আমরা সহজ, কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত ৫টি ধাপে হজমশক্তি বৃদ্ধির উপায় আলোচনা করব, যা ৭ বছরের বাচ্চাও সহজে বুঝতে পারবে।

১। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা

হজমশক্তি বাড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা। খাদ্যাভ্যাস ঠিক থাকলে আমাদের পেট ঠিকভাবে খাবার ভেঙে পুষ্টি শোষণ করতে পারে। প্রথমেই, খাবার ধীরে ধীরে খাওয়া উচিত। অনেক সময় আমরা দ্রুত খাবার খাই, এতে হজম প্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করতে পারে না এবং পেট ফোলাভাব বা গ্যাসের সমস্যা হতে পারে।

পুষ্টিকর খাবার নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। তাজা শাকসবজি, ফলমূল, দানা জাতীয় খাবার এবং হালকা প্রোটিন যেমন ডিম, মাছ বা মুরগির মাংস হজমে সহায়ক। খুব চর্বি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উচিত, কারণ এগুলো হজমকে ধীর করে। এছাড়া, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা হজমের জন্য অপরিহার্য। পানি খাবারের অণুগুলো ভেঙে দেহে সহজে শোষিত হতে সাহায্য করে।

ছোটখাটো খাবারের জন্য দিনের মধ্যে কয়েকবার খাবার খাওয়া ভালো। এটি হজমপ্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখে এবং পেটের উপর চাপ কমায়। হজমের জন্য খাদ্যের মধ্যে ফাইবার খুব গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ফলমূল, ওটস বা চিনি কমানো শস্য হজমকে প্রাকৃতিকভাবে উন্নত করে।

পরিশেষে, খাদ্যের সময় মনোযোগী হওয়া দরকার। টেলিভিশন বা মোবাইলের দিকে নজর না দিয়ে খাবার খেলে মস্তিষ্ক এবং পাচনতন্ত্র একসাথে কাজ করে। এতে হজমশক্তি ভালো থাকে এবং খাবারের পুষ্টি দেহে পুরোপুরি প্রবেশ করে।

সুতরাং, ধীরে খাবার খাওয়া, পুষ্টিকর এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং খাবারের সময় মনোযোগী থাকা হজমশক্তি বাড়ানোর প্রথম ধাপ।

নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ 

হজমশক্তি বাড়ানোর আরও একটি কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক নয়, এটি পাচনতন্ত্রের কার্যকারিতাকেও উন্নত করে। হাঁটা, সাইক্লিং, হালকা দৌড়, যোগব্যায়াম বা সাঁতার—all এই ধরণের অনুশীলন পেটের পেশিকে সক্রিয় রাখে এবং খাবার দ্রুত হজম হতে সাহায্য করে।

যখন আমরা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকি, আমাদের দেহে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে হজমপ্রক্রিয়ার জন্য জরুরি এনজাইম ও অ্যাসিড ভালোভাবে কাজ করে। বিশেষ করে খাবারের ৩০ মিনিট পর হালকা হাঁটা হজমকে সহজ করে এবং পেট ফোলা বা অজস্র গ্যাসের সমস্যা কমায়।

যোগব্যায়াম হজমশক্তি বাড়ানোর জন্য খুব উপকারী। ‘পশ্চিমমুখী কুম্ভকাসন’, ‘ভুজঙ্গাসন’ বা ‘বৃক্ষাসন’ এর মতো সহজ আসন পেটের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং অন্ত্রের চলাচলকে উন্নত করে। এটি হজমপ্রক্রিয়াকে দ্রুত এবং কার্যকর করে তোলে।

শারীরিক কার্যকলাপ শুধু হজম নয়, মানসিক চাপও কমায়। মানসিক চাপ হজমের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীর ও মস্তিষ্কে শান্তি আসে, যা খাবারের সঠিক হজমের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ছোটখাটো পরিবর্তনও বড় প্রভাব ফেলে। অফিসে বসে কাজ করলে মাঝে মাঝে উঠে হালকা হাঁটা, লিফট না ব্যবহার করে সিঁড়ি ব্যবহার করা—সবই হজমকে সহায়তা করে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ মেলানো হলে হজমশক্তি অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

প্রোবায়োটিক ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার 

হজমশক্তি বাড়ানোর জন্য প্রোবায়োটিক ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রোবায়োটিক হলো “ভালো ব্যাকটেরিয়া,” যা আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে। দই, কেফির, ছোলা-ডালজাতীয় খাবার এবং কিমচি প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ। এই খাবারগুলো হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং পেটের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা করে।

ফাইবারও হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফাইবার অন্ত্রের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে, খাবার সহজে চলাচল করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। শাকসবজি, ফলমূল, ওটস, বাদাম ও দানা জাতীয় খাবার ফাইবারের ভালো উৎস। সকালে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া হজমকে সক্রিয় রাখে এবং পুরো দিনকে সতেজ রাখে।

প্রোবায়োটিক ও ফাইবার একসাথে হজমশক্তি বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, দইয়ের সঙ্গে ওটস মিশিয়ে খেলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ও খাদ্য চলাচল দুটোই সুস্থ থাকে। এভাবে খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি দেহে পুরোপুরি প্রবেশ করে, যা শরীরকে শক্তিশালী ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় সমৃদ্ধ রাখে।

এছাড়া, হজমের জন্য খাদ্য এবং জল পানির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি না পেলে ফাইবার ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। তাই দিনে কমপক্ষে ৬–৮ গ্লাস পানি খাওয়া উচিত। এছাড়া, অতি চিনি বা চর্বিযুক্ত খাবার ফাইবার এবং প্রোবায়োটিকের কার্যকারিতা কমাতে পারে, তাই এ ধরনের খাবার সীমিত রাখা ভালো।

ফলে, প্রোবায়োটিক ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়া হজমশক্তি বৃদ্ধি, অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং শরীরকে সতেজ রাখার একটি সহজ ও কার্যকর উপায়।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ঘুম 

হজমশক্তি শুধুমাত্র খাদ্য বা শারীরিক কার্যকলাপের ওপর নির্ভর করে না, মানসিক স্বাস্থ্যও এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। মানসিক চাপ বা উদ্বেগ থাকলে আমাদের দেহে হজমের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন ও এনজাইম সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে খাবার ঠিকমতো হজম হয় না, পেট ফোলাভাব, অজস্র গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।

মানসিক চাপ কমানোর জন্য ধ্যান, যোগব্যায়াম বা প্রানায়াম খুব কার্যকর। প্রতিদিন অন্তত ১০–১৫ মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে মস্তিষ্ক শান্ত হয় এবং পাচনতন্ত্রকে সহায়তা করে। এছাড়াও, হালকা সঙ্গীত শোনা বা প্রিয় বই পড়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

পর্যাপ্ত ঘুমও হজমশক্তির জন্য অপরিহার্য। রাতে ৭–৮ ঘণ্টার গুণগতমানসম্পন্ন ঘুম না হলে অন্ত্রের চলাচল ধীর হয়ে যায় এবং খাবারের পুষ্টি দেহে পুরোপুরি শোষিত হয় না। ঘুম কম হলে শরীরে হজম প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় হরমোনের সঠিক মাত্রা বজায় থাকে না, যা হজমশক্তিকে প্রভাবিত করে।

ছোট ছোট অভ্যাসও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। যেমন, দিনের কাজের সময় ছোট বিরতি নেওয়া, ফোন বা কম্পিউটার থেকে একটু দূরে থাকা, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানো—সবই হজমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ফলে, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম হজমশক্তি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য, শারীরিক কার্যকলাপের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা ঠিক রাখলে হজমশক্তি শক্তিশালী হয় এবং পেটের সমস্যা কমে।

খাওয়ার নিয়মিত সময় ও ছোট খাবার 

হজমশক্তি বৃদ্ধির জন্য খাবারের নিয়মিত সময় নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেহ একটি অভ্যস্ত রুটিন অনুযায়ী কাজ করতে ভালোবাসে। প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খেলে পাচনতন্ত্রও সঠিক সময়ে প্রস্তুত থাকে এবং হজম প্রক্রিয়া সহজ হয়। অনিয়মিত খাবার খেলে পেট ফোলা, গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।

ছোটখাটো খাবার খাওয়াও হজমকে সহজ করে। বড় বড় খাবার একবারে খেলে পেটের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায় এবং হজম ধীর হয়ে যায়। দিনে ৩ প্রধান খাবারের সঙ্গে ২–৩টি হালকা নাস্তা অন্তর্ভুক্ত করলে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে। যেমন, দুপুরে হালকা ফলমূল বা বাদাম খাওয়া, বিকেলে দই বা ওটস খাওয়া হজমকে সহায়তা করে।

খাবারের ধরনেও মনোযোগ দিতে হবে। মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত খাবার হজমকে ধীর করে, তাই সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। খাবার ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাওয়া হজমশক্তিকে উন্নত করে। এছাড়া, খাওয়ার সময় জল কমপক্ষে এক গ্লাস পান করা পেটের কার্যকারিতা বাড়ায় এবং খাবারের অণু সহজে ভেঙে পুষ্টি দেহে শোষিত হয়।

খাবারের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। শান্ত পরিবেশে, মনোযোগ দিয়ে খাবার খেলে হজম প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হয়। টিভি বা মোবাইলের দিকে নজর না দিয়ে খাবার খাওয়া অন্ত্রের পেশিকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। শিশুদের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের হজমশক্তি প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় আরও সংবেদনশীল।

ফলে, নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, ছোট খাবার গ্রহণ, ধীরে চিবিয়ে খাওয়া এবং খাবারের পরিবেশ ঠিক রাখা হজমশক্তি বাড়ানোর একটি সহজ, কার্যকর এবং প্রাকৃতিক উপায়। এই অভ্যাসগুলি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্যও অপরিহার্য।

উপসংহার 

হজমশক্তি বৃদ্ধি করা একটি সুস্থ জীবনযাপনের মূল ভিত্তি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, প্রোবায়োটিক ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম, খাবারের নিয়মিত সময়—all এই অভ্যাসগুলো মেনে চললে হজমশক্তি শক্তিশালী হয়।

ভালো হজমশক্তি শুধু পেটের সমস্যা কমায় না, শরীরকে সতেজ, শক্তিশালী এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় সমৃদ্ধ রাখে। তাই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো দৈনন্দিন জীবনে অন্তর্ভুক্ত করে আমরা সহজেই আমাদের হজমশক্তি বাড়াতে পারি এবং সুস্থ জীবন উপভোগ করতে পারি।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page