বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে পাট একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ফসল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে মোট পাট উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। এর পাশাপাশি পাটকাঠি উৎপাদন ৩০ লাখ মেট্রিক টন এবং চারকোল উৎপাদন ৬ লাখ মেট্রিক টন-এ পৌঁছেছে, যা পাটখাতের বহুমুখী ব্যবহার ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে তুলছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা
আসন্ন ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য পাট চাষের জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ০৫ লাখ হেক্টর। এই বিপুল পরিমাণ জমিতে পাট চাষের জন্য প্রয়োজন হবে আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টন উন্নতমানের পাটবীজ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উন্নত জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই জমি থেকেই উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
বিজেআরআই’র গবেষণা কর্মশালায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ
গত ৩০ জুন ২০২৫ (সোমবার) বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)-এর কৃষি উইং আয়োজিত ‘বার্ষিক অভ্যন্তরীণ গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালা–২০২৫’ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। কর্মশালাটি পাট গবেষণা, উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি সচিবের বক্তব্য: পাটের সম্ভাবনা কখনো শেষ হবে না
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন,
“পাট নিয়ে অনেক কিছু করার আছে। পাটের সম্ভাবনা কখনোই শেষ হবে না। কাঁচা পাট নিয়ে অন্যান্য দেশ কীভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে গভীর মার্কেট রিসার্চ প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, সীমিত কৃষিজমি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। এর জন্য বিজ্ঞানীদের বদ্ধ চিন্তাধারা থেকে বের হয়ে বাজার ও বাস্তবতার নিরিখে গবেষণা করতে হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাটভিত্তিক প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটের অবস্থান
কৃষি সচিবের মতে, অনেক দেশ পরিবেশগত কারণে পাট উৎপাদন করতে পারে না। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই পাট উৎপাদনের জন্য আশীর্বাদপুষ্ট একটি দেশ। তিনি উল্লেখ করেন, কিউবার মতো দেশও বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানি করে কারখানা স্থাপন করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পাটের চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
পাট গবেষণায় বিজেআরআই’র সাফল্য
কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে বিজেআরআই’র মহাপরিচালক ড. নার্গিস আক্তার বলেন,
“পাট কেবল সোনালি আঁশ নয়, এটি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক সোনালি অধ্যায়।”
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত বিজেআরআই মোট
- ৫৭টি পাটের জাত,
- ২২৩টি কৃষি প্রযুক্তি,
- এবং ৬৯টি শিল্প ও কারিগরি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
এই গবেষণার ফলে পাটচাষ আরও লাভজনক হয়েছে এবং কৃষকরা আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সুবিধা পাচ্ছেন।
কৃষক ও রপ্তানিকারকদের জন্য সরকারি সুবিধা
পাটকে কৃষিজাত পণ্য হিসেবে বিবেচনা করায় চাষিরা কৃষিঋণের মতো পাটঋণ পাচ্ছেন। পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা চালু রয়েছে। বিশেষ করে চারকোল রপ্তানিকারকদের জন্য ২০% নগদ প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০টি চারকোল কারখানা রয়েছে, যদিও নানা কারণে কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়লে এই শিল্পে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় আরও বাড়বে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাটের চাহিদা বিশ্ববাজারে ক্রমেই বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটপণ্য ব্যবহারের প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে—
- উন্নত বীজের সহজ প্রাপ্যতা
- আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি
- শক্তিশালী মার্কেট রিসার্চ
- এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ
অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, বছরে ১৫ লাখ টন পাট উৎপাদন বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি বড় শক্তি। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও বাজারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে পাট আবারও দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। পাট শুধু অতীতের গৌরব নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও এক উজ্জ্বল প্রতীক।