পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানো অনেক ছাত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় আমরা বই পড়ি কিন্তু কিছুই মনে রাখতে পারি না। কিন্তু কিছু সহজ শর্টকাট টিপস এবং কৌশল মেনে চললে আমরা সহজেই তথ্য মনে রাখতে পারি এবং পড়াশোনায় আরও দক্ষ হতে পারি।
এই টিপসগুলো শুধু দ্রুত মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ায় না, বরং শেখার আনন্দও দেয়। ছোট-বড় সবাই এই কৌশলগুলো ব্যবহার করতে পারে। আসুন জানি, কিভাবে ছোট ছোট অভ্যাস ও কৌশলের মাধ্যমে আমরা পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়াতে পারি এবং পরীক্ষায় আরও ভালো ফলাফল আনতে পারি।
১। দৃঢ় মনোযোগ (Focused Attention)
পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মনোযোগ ধরে রাখা। যখন আমরা কিছু পড়ি, তখন যদি মন একদম অন্যত্র থাকে, তখন তথ্য মস্তিষ্কে ঠিকভাবে সংরক্ষিত হয় না। তাই পড়ার সময় সম্পূর্ণভাবে মনোযোগ দিতে হবে। একটি শান্ত এবং störাবাহিত পরিবেশে পড়া সবচেয়ে ভালো। ফোন, টিভি বা অন্যান্য ব্যাঘাতকারী জিনিসগুলো দূরে রাখুন।
মনোযোগ বাড়ানোর জন্য ছোট ছোট ব্রেক নেওয়াও খুব কার্যকর। ধরুন, আপনি ২৫ মিনিট পড়ার পরে ৫ মিনিট বিরতি নিলেন – এই পদ্ধতিটিকে Pomodoro Technique বলা হয়। এটি মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে এবং শেখা আরও কার্যকর হয়। এছাড়া, পড়ার সময় নোট নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো হাইলাইট করা মনোযোগ বাড়ায়।
আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হলো এক সময়ে এক বিষয় পড়া। একাধিক বিষয় একসাথে পড়লে মন বিভ্রান্ত হয় এবং তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে শুধুমাত্র একটি বিষয় বা অধ্যায়ের উপর ফোকাস করুন। এছাড়া, পড়ার আগে মুখস্থ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা মনোযোগ বাড়ায়।
ছোট্ট কৌশল হিসেবে, পড়ার সময় নিজের চোখে পড়া তথ্যগুলো মুখে উচ্চারণ করুন। এটি active recall পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে এবং মস্তিষ্কে তথ্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়। প্র্যাকটিস যত বেশি করবেন, মনোযোগ ধরে রাখা তত সহজ হবে।
সংক্ষেপে, পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর প্রথম ধাপ হলো মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করা। শান্ত পরিবেশ, সময় নিয়ন্ত্রণ, এক বিষয়ে ফোকাস এবং active recall-এর মাধ্যমে আমরা আমাদের পড়াশোনার দক্ষতা অনেক বৃদ্ধি করতে পারি।
২। পুনরাবৃত্তি (Regular Revision)
পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো পুনরাবৃত্তি করা। আমরা অনেক তথ্য পড়ি, কিন্তু তা মনে রাখতে পারি না যদি আমরা নিয়মিত তা পুনরাবৃত্তি না করি। মস্তিষ্ক তথ্য সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত পুনরাবৃত্তি খুবই জরুরি। এটি long-term memory গঠনে সাহায্য করে।
প্রথম ধাপ হলো পড়ার পরই ছোট ছোট নোট বা সংক্ষিপ্ত সারাংশ তৈরি করা। এরপর নিয়মিত এই নোটগুলো চোখের সামনে রাখা এবং পড়া। প্রতিদিন বা সপ্তাহে কয়েকবার দ্রুত পুনরায় পড়া মস্তিষ্কে তথ্যকে শক্তভাবে স্থায়ী করে। এছাড়া, প্রতিদিন কিছুক্ষণ পুরনো অধ্যায় পুনরায় দেখা হলে নতুন তথ্য শেখার সাথে পুরনো তথ্যও মনে থাকে।
একটি কার্যকর কৌশল হলো Spaced Repetition Technique। এর মাধ্যমে আমরা তথ্য একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে সময় ব্যবধানে পুনরায় পড়ি। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম দিন নতুন তথ্য শেখা হলে পরের দিন, তারপর তিন দিন পর, তারপর সাত দিন পর আবার দেখার মাধ্যমে আমরা তথ্য মনে রাখতে পারি। এটি মস্তিষ্ককে চাপ না দিয়ে তথ্য দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখে।
পুনরাবৃত্তি আরও কার্যকর হয় যদি আমরা পড়ার সময় স্ব-পরীক্ষা বা Quiz করি। নিজেকে প্রশ্ন করা বা কার্ডের মাধ্যমে তথ্য পরীক্ষা করা active recall বাড়ায় এবং তথ্য মস্তিষ্কে গভীরভাবে সংরক্ষিত হয়। এটি শুধু পড়াশোনা মনে রাখার জন্য নয়, পরীক্ষায় ভালো করার জন্যও খুব উপকারী।
সংক্ষেপে, নিয়মিত পুনরাবৃত্তি আমাদের পড়াশোনার প্রভাবকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে। সঠিক পরিকল্পনা এবং স্পেসড রিপিটিশন পদ্ধতি মেনে চললে আমরা তথ্য দ্রুত মনে রাখি এবং মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করতে পারি।
৩। চিত্র ও মেমোরি এ্যাসোসিয়েশন (Visualization & Memory Association)
পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর আরও একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো চিত্র বা ভিজ্যুয়ালাইজেশন ব্যবহার করা। মস্তিষ্ক সাধারণত ছবি ও চিত্রকে তথ্যের চেয়ে বেশি ভালো মনে রাখে। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোকে চিত্র, ডায়াগ্রাম বা মানচিত্রের মাধ্যমে সাজানো হলে তা দ্রুত মনে রাখা যায়।
চিত্র ব্যবহার করার আরেকটি কৌশল হলো মেমোরি এ্যাসোসিয়েশন। নতুন তথ্যের সাথে পরিচিত বা সহজে মনে রাখার মতো কিছু বস্তু বা ঘটনা সংযুক্ত করা। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি কোনও বড় তথ্যের তালিকা মুখস্থ করতে চান, প্রতিটি পয়েন্টকে একটি সহজ ছবি বা গল্পের সঙ্গে যুক্ত করুন। যখন প্রয়োজন পড়বে, তখন মস্তিষ্ক সেই গল্প বা ছবি মনে করে তথ্যটি ফিরে পাবে।
ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বোঝাই: ধরুন, ইতিহাসের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে রাখতে হবে। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে একটি চিত্র বা ইমেজ যুক্ত করুন – যেমন যুদ্ধের দৃশ্য, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বা প্রতীকী ছবি। এখন পরীক্ষার সময় এই ছবি মনে করলে পুরো তথ্য মনে পড়বে। একইভাবে, বিজ্ঞানের সূত্র বা জ্যামিতির ফর্মুলাও চিত্রের মাধ্যমে মনে রাখা অনেক সহজ হয়।
আরেকটি উপায় হলো Mind Mapping। এটি এমন একটি কৌশল যেখানে মূল ধারণা কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয় এবং সম্পর্কিত বিষয়গুলো শাখার মতো ছড়িয়ে থাকে। মস্তিষ্ক সহজে ছবির মতো দেখলে তথ্যকে স্মৃতিতে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে।
সংক্ষেপে, চিত্র এবং মেমোরি এ্যাসোসিয়েশন ব্যবহার করলে তথ্য শুধু মনে থাকে না, বরং তা আরও সহজভাবে মনে পড়ে। পড়াশোনার সাথে সৃজনশীলতা যুক্ত করলে শেখার প্রক্রিয়াও মজাদার হয় এবং মস্তিষ্ক শক্তিশালী হয়।
৪। সক্রিয় শেখার কৌশল (Active Learning Techniques)
পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সক্রিয় বা অ্যাকটিভ লার্নিং। সাধারণভাবে আমরা অনেক সময় শুধু পড়ে নিই, কিন্তু তা মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে জমা হয় না। সক্রিয় শেখার মাধ্যমে আমরা তথ্যকে সরাসরি ব্যবহার করি, যা মনে রাখাকে সহজ ও কার্যকর করে।
একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো Self-Explanation। পড়ার সময় নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন। মনে মনে বা জোরে জোরে বলার মাধ্যমে আমরা তথ্যকে মস্তিষ্কে শক্তভাবে স্থাপন করি। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান বা ইতিহাসের একটি বিষয় পড়ার পর নিজেকে বলুন, “এটি কীভাবে ঘটেছে এবং কেন?” এই প্রক্রিয়ায় তথ্য শুধু মুখস্থ নয়, আমরা তা বুঝেও নিই।
আরেকটি কার্যকর কৌশল হলো প্রশ্ন তৈরি করা। পড়ার সময় নিজের জন্য প্রশ্ন তৈরি করুন এবং পরে উত্তর দিন। এটি Active Recall-এর মতো কাজ করে। শুধু পড়া নয়, প্রশ্ন করা এবং উত্তর খোঁজা মস্তিষ্ককে তথ্য পুনরায় সংগঠিত করতে সাহায্য করে। যেমন, “এই সূত্রটি কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়?” বা “এই ঘটনার প্রভাব কী ছিল?” – এই ধরনের প্রশ্ন মনে রাখাকে শক্তিশালী করে।
গ্রুপ স্টাডিও সক্রিয় শেখার জন্য ভালো। বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়গুলো আলোচনা করা বা teaching technique ব্যবহার করা খুবই কার্যকর। যখন আমরা অন্যকে শেখাই, তখন আমরা নিজের জ্ঞানও আরও দৃঢ় করি। এই পদ্ধতিতে আমাদের মস্তিষ্ক কেবল তথ্য সংরক্ষণ করে না, বরং তা প্রয়োগের ক্ষমতাও বাড়ায়।
সংক্ষেপে, সক্রিয় শেখার কৌশল ব্যবহার করলে পড়াশোনা শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং বোঝা ও প্রয়োগের একটি প্রক্রিয়া হয়। Self-Explanation, প্রশ্ন তৈরি এবং আলোচনা মস্তিষ্ককে কার্যকরভাবে সক্রিয় রাখে এবং স্মৃতি শক্তি দৃঢ় করে।
৫। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস (Adequate Rest & Healthy Habits)
পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর শেষ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। মস্তিষ্ক তখনই কার্যকরভাবে তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে যখন আমাদের শরীর ও মন ঠিকভাবে কাজ করছে। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করলেও যদি পর্যাপ্ত ঘুম না হয়, তাহলে তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৭–৮ ঘন্টা ঘুম স্মৃতি শক্তি বাড়াতে এবং শেখা স্থায়ী করতে সহায়ক।
শরীরের স্বাস্থ্যও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ব্যায়াম, যেমন হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা ফিটনেস, মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি করে এবং শিক্ষার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। এছাড়া, সুষম খাবার, যেমন ফল, সবজি, বাদাম এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, মস্তিষ্ককে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেয়। বিশেষ করে Omega-3 ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং স্মৃতি উন্নত করে।
এছাড়া, পড়াশোনার সময় সংক্ষিপ্ত বিরতি নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় একটানা পড়লে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যায় এবং তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়। ৫–১০ মিনিটের ছোট বিরতি মস্তিষ্ককে পুনরায় সতেজ করে। এছাড়া, পড়াশোনার সময় জলপান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করে।
মানসিক চাপও স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে। তাই পড়াশোনার সময় ধ্যান বা মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করা খুব কার্যকর। এটি আমাদের মনকে শান্ত রাখে, উদ্বেগ কমায় এবং শেখার প্রক্রিয়াকে আরও মসৃণ করে।
সংক্ষেপে, পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ছোট বিরতি এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করলে মস্তিষ্ক কার্যকরভাবে তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য এগুলো অপরিহার্য।
উপসংহার
পড়াশোনায় স্মৃতি শক্তি বাড়ানো কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু সঠিক কৌশল এবং নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমে এটি সম্ভব। মনোযোগ ধরে রাখা, নিয়মিত পুনরাবৃত্তি, চিত্র ও মেমোরি এ্যাসোসিয়েশন, সক্রিয় শেখার কৌশল এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মিলে আমাদের পড়াশোনার দক্ষতা অনেক বৃদ্ধি করে। ছোট ছোট পরিবর্তন এবং ধারাবাহিক অভ্যাসই বড় ফলাফল নিয়ে আসে। এই শর্টকাট টিপসগুলো প্রয়োগ করলে আমরা দ্রুত তথ্য মনে রাখতে পারি, শেখার আনন্দ বাড়াতে পারি এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আনতে সক্ষম হই।
স্মৃতি শক্তি বাড়ানো সম্পর্কে 1০ টি সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর।
প্রশ্ন ১। স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় কী?
স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিয়মিত মনোযোগ ধরে রাখা। যখন আমরা পড়াশোনার সময় মনোযোগ নিই, মস্তিষ্ক তথ্যকে সহজে গ্রহণ এবং সংরক্ষণ করতে পারে। পড়ার সময় ফোন বা টিভি বন্ধ রাখা, শান্ত পরিবেশে পড়া এবং একটি নির্দিষ্ট সময় ফোকাস করা খুবই কার্যকর।
এছাড়া, পড়াশোনার পরে ছোট ছোট পুনরাবৃত্তি করা, নিজেকে প্রশ্ন করা বা নোট তৈরি করা তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত অনুশীলন করলে মনে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং শেখা আরও সহজ ও মজাদার হয়।
প্রশ্ন ২। প্রতিদিন কত সময় স্মৃতি শক্তি উন্নয়নের জন্য পড়াশোনা করা উচিত?
স্মৃতি শক্তি উন্নয়নের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ১–২ ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশোনা করা উচিত। তবে এটি একটানা নয়, বরং ছোট ছোট সময়ে বিভক্ত করলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয় না এবং তথ্য সহজে মনে থাকে। ২৫–৩০ মিনিট পড়া, ৫ মিনিট বিরতি নেওয়া কার্যকর পদ্ধতি।
ছোট বিরতির সময় হালকা হাঁটাহাঁটি বা জলপান করলে মস্তিষ্ক সতেজ থাকে। নিয়মিত অনুশীলন এবং সময় মেনে পড়াশোনা করলে স্মৃতি শক্তি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং নতুন তথ্য দ্রুত মনে রাখা যায়।
প্রশ্ন ৩। স্মৃতি শক্তি বাড়াতে কি শুধু বই পড়া যথেষ্ট?
না, শুধুমাত্র বই পড়া স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট নয়। মস্তিষ্কের তথ্য সংরক্ষণ এবং মনে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে active learning গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে পড়ার সময় নিজেকে প্রশ্ন করা, তথ্যকে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা এবং নোট নেওয়া অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া, চিত্র বা মানচিত্র ব্যবহার, গল্পের সঙ্গে তথ্য যুক্ত করা এবং পুনরাবৃত্তি করা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। নিয়মিত অনুশীলন এবং সৃজনশীল শেখার পদ্ধতি ব্যবহার করলে আমরা শুধু তথ্য পড়ি না, তা দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখতেও পারি।
প্রশ্ন ৪। নতুন দক্ষতা শেখা স্মৃতি শক্তির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন দক্ষতা শেখা মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ ও উদ্দীপনা দেয়, যা স্মৃতি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। যখন আমরা নতুন কিছু শিখি, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হয় এবং স্নায়ুতন্ত্র শক্তিশালী হয়। এটি শুধু পড়াশোনার তথ্য মনে রাখার জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানেও কার্যকর।
উদাহরণস্বরূপ, নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা নতুন গণিত কৌশল অনুশীলন করলে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক বাড়ে। নিয়মিত নতুন দক্ষতা শেখার অভ্যাস স্মৃতি শক্তি বজায় রাখে এবং বয়স বাড়লেও মস্তিষ্ক সচল রাখে।
প্রশ্ন ৫। স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য কি খাবারের কোনো ভূমিকা আছে?
হ্যাঁ, স্মৃতি শক্তি বাড়াতে খাবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ফল এবং সবজি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করে। বাদাম, মাছ, ডিম, বেরি প্রভৃতি খাবার স্মৃতি শক্তি বাড়াতে বিশেষভাবে সহায়ক।
এছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান এবং হালকা সুষম খাবার মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে। জাঙ্ক ফুড এবং অতিরিক্ত চিনি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চললে পড়াশোনায় মনোযোগ, স্মৃতি শক্তি এবং শেখার দক্ষতা উন্নত হয়।
প্রশ্ন ৬। স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য কি ঘুমের কোনো গুরুত্ব আছে?
হ্যাঁ, স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের তথ্যগুলোকে সংরক্ষণ করে এবং long-term memory তৈরি করে। ঘুম না হলে নতুন তথ্য মনে রাখা কঠিন হয় এবং পড়াশোনার ফলাফল কমে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। বিশেষ করে ছোট বিরতি সহ গভীর ঘুম স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করে। তাই নিয়মিত সময়ে ঘুমানো এবং রাতভর পড়াশোনা এড়ানো উচিত।
প্রশ্ন ৭। স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য কি ব্যায়াম কার্যকর?
হ্যাঁ, নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং স্মৃতি শক্তি বাড়ায়। হাঁটা, যোগব্যায়াম বা হালকা জিমের মাধ্যমে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, যা মস্তিষ্কে অক্সিজেন এবং পুষ্টি পৌঁছে দেয়। এটি নতুন তথ্য শিখতে এবং মনে রাখতে সাহায্য করে।
এছাড়া ব্যায়াম স্ট্রেস কমায় এবং মেজাজ উন্নত করে। মস্তিষ্ক যখন চাপমুক্ত এবং সতেজ থাকে, তখন তথ্য দ্রুত মনে রাখা যায়। তাই পড়াশোনার সাথে নিয়মিত ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত করা স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ৮। স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য পুনরাবৃত্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
পুনরাবৃত্তি বা regular revision স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যতবার তথ্য পুনরায় পড়ি, মস্তিষ্ক তা long-term memory-তে সংরক্ষণ করে। নতুন তথ্য একবারে মনে রাখা কঠিন, কিন্তু নিয়মিত পুনরাবৃত্তি মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করে।
উদাহরণস্বরূপ, প্রথমে নতুন তথ্য শেখার পর পরের দিন, তিন দিন পর, সাত দিন পর পুনরায় দেখলে তা সহজে মনে থাকে। নিয়মিত এবং পরিকল্পিত পুনরাবৃত্তি তথ্য মনে রাখাকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আনতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ৯। পড়াশোনার সময় মনোযোগ ধরে রাখার উপায় কী?
পড়াশোনার সময় মনোযোগ ধরে রাখার জন্য শান্ত এবং নিরব পরিবেশ নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। ফোন, টিভি বা অন্যান্য ব্যাঘাতকারী জিনিস দূরে রাখুন। ছোট বিরতি নেয়া, যেমন ২৫–৩০ মিনিট পড়াশোনা ও ৫ মিনিট বিরতি, মনোযোগ বাড়ায়।
আরেকটি কার্যকর উপায় হলো এক সময়ে এক বিষয় পড়া। একাধিক বিষয় একসাথে পড়লে মন বিভ্রান্ত হয়। এছাড়া, পড়ার আগে লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং নিজেকে প্রশ্ন করা active recall-এর মাধ্যমে মনোযোগ বাড়ায় এবং স্মৃতি শক্তি দৃঢ় করে।
প্রশ্ন ১০। স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য চিত্র ও গল্প ব্যবহার কতটা কার্যকর?
চিত্র বা গল্প ব্যবহার স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর জন্য খুবই কার্যকর। মস্তিষ্ক সাধারণভাবে ছবি বা গল্প সহজে মনে রাখে। নতুন তথ্যকে একটি গল্প বা চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করলে তা long-term memory-তে স্থায়ী হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইতিহাসের ঘটনা বা বৈজ্ঞানিক তথ্যকে একটি চিত্র বা ছোট গল্পের সঙ্গে মেলালে সহজে মনে থাকে।
Mind Mapping বা Visual Association-এর মাধ্যমে তথ্যের সম্পর্ক বোঝা সহজ হয়। পড়াশোনায় সৃজনশীলতা যুক্ত করলে তথ্য মনে রাখা মজাদার এবং কার্যকর হয়। চিত্র ও গল্প ব্যবহার করলে পড়াশোনার প্রভাব অনেক বৃদ্ধি পায়।