আমাদের শরীর প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করে—হাঁটা, দৌড়ানো, কথা বলা, ভাবা, হাসা কিংবা কাঁদা। এসব কাজ করার জন্য মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে বার্তা পৌঁছে যায়। এই বার্তা বহন করে ছোট ছোট বিশেষ কোষ, যাদের বলে নিউরন।
নিউরনকে আসলে আমাদের শরীরের “বার্তাবাহক” বলা যায়। যেমন মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠালে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু পায়, তেমনি মস্তিষ্ক যখন কোনো নির্দেশ দেয়, নিউরন তা দ্রুত শরীরের অন্য অংশে পৌঁছে দেয়। এই নিবন্ধে আমরা ধাপে ধাপে শিখব, নিউরন আসলে কীভাবে কাজ করে এবং কেন এটি আমাদের জীবনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ।
১। নিউরনের গঠন ও প্রধান অংশ
নিউরন হলো আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মূল ভিত্তি। প্রতিটি নিউরন দেখতে অনেকটা ছোট তারের মতো, কিন্তু এর ভেতরে এমন কিছু অংশ আছে যা একসাথে কাজ করে আমাদের শরীরে বার্তা আদান-প্রদান করতে সাহায্য করে। সাধারণত একটি নিউরনকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—ডেনড্রাইট, সেল বডি বা সোমা এবং এক্সন।
ডেনড্রাইট হলো শাখার মতো অংশ, যা নিউরনের চারপাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। ধরুন আপনার বন্ধু আপনাকে কথা বলল, তখন সেই শব্দের সিগন্যাল আপনার কানে ঢুকে স্নায়ুর মাধ্যমে ডেনড্রাইটে পৌঁছায়। এরপর সেই তথ্য চলে যায় নিউরনের মূল অংশে।
সেল বডি বা সোমা হলো নিউরনের কেন্দ্র। একে আপনি নিউরনের “মিনি ব্রেইন” বলতে পারেন। এখানে সমস্ত তথ্য প্রক্রিয়াজাত হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরবর্তী ধাপে বার্তা পাঠানো হবে কি না। সোমার ভেতরে নিউক্লিয়াস থাকে, যা কোষের কাজ পরিচালনা করে।
এক্সন হলো লম্বা একটি সরু অংশ, যা অনেকটা বৈদ্যুতিক তারের মতো কাজ করে। একবার বার্তা তৈরি হলে এটি এক্সনের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যায়। এক্সনের শেষে থাকে সিন্যাপস, যেখানে বার্তাটি অন্য নিউরন বা পেশী কোষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এছাড়াও এক্সনের চারপাশে থাকে মাইলিন শিথ, যা অনেকটা তারের উপর প্লাস্টিক কভার মতো কাজ করে। এটি বার্তা পৌঁছানোকে আরও দ্রুত ও নিরাপদ করে তোলে। যদি মাইলিন না থাকে, তাহলে বার্তা ধীর গতিতে চলবে বা মাঝপথে থেমে যেতে পারে।
এভাবে ডেনড্রাইট তথ্য নেয়, সোমা তা প্রক্রিয়াজাত করে এবং এক্সন সেটি গন্তব্যে পাঠায়। একে অনেকটা স্কুলে শিক্ষক থেকে ছাত্রের কাছে তথ্য পৌঁছানোর মতো ভাবা যায়। শিক্ষক (ডেনড্রাইট) প্রশ্ন শুনে নেয়, মস্তিষ্ক (সোমা) উত্তর ভেবে নেয়, আর মাইক্রোফোন (এক্সন) দিয়ে সেই উত্তর সবার কাছে পৌঁছে দেয়।
অর্থাৎ, নিউরনের প্রতিটি অংশের আলাদা আলাদা কাজ আছে, আর এরা একসাথে কাজ করেই আমাদের শরীরকে সচল রাখে।
২। নিউরনের মাধ্যমে বার্তা পরিবহন
আমরা জানি, নিউরনের কাজ হলো মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই বার্তা আসলে কীভাবে চলে? একে বলা হয় নার্ভ ইমপালস বা স্নায়বিক তরঙ্গ।
প্রথমে ডেনড্রাইট কোনো তথ্য গ্রহণ করে। যেমন ধরুন, আপনি গরম কিছু স্পর্শ করলেন। তখন আপনার ত্বকের সেন্সরি নিউরন সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্তেজনা বা সিগন্যাল ধরে ফেলে। এই সিগন্যাল ডেনড্রাইট থেকে প্রবাহিত হয়ে সোমাতে পৌঁছায়।
এরপর সোমা সিদ্ধান্ত নেয় যে বার্তাটি এক্সনের মাধ্যমে পাঠাতে হবে। তখন নিউরনের ভেতরে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়, যাকে বলে অ্যাকশন পটেনশিয়াল। একে অনেকটা বিদ্যুৎ প্রবাহের মতো কল্পনা করা যায়। একবার এই চার্জ তৈরি হলে, এটি এক্সনের ভেতর দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যায়।
এক্সনের চারপাশে থাকা মাইলিন শিথ এই চার্জকে আরো দ্রুত চলতে সাহায্য করে। যেমন একটি সুপারফাস্ট ট্রেন থেমে না গিয়ে টানা চলতে পারে, তেমনি মাইলিন থাকার কারণে সিগন্যাল দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
অবশেষে সিগন্যাল চলে আসে এক্সনের একেবারে শেষ প্রান্তে, যাকে বলে অ্যাক্সন টার্মিনাল। এখানেই ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা—বার্তাটি বৈদ্যুতিক থেকে রাসায়নিক সিগন্যালে রূপান্তরিত হয়। কারণ, এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র ফাঁক থাকে, যাকে বলে সিন্যাপস। বৈদ্যুতিক সিগন্যাল সেই ফাঁক পার হতে পারে না। তাই এখানে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ, যাদের বলে নিউরোট্রান্সমিটার, তারা বার্তাটি এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে পৌঁছে দেয়।
এই পুরো প্রক্রিয়া ঘটে চোখের পলকে। আপনি গরম জিনিসে হাত দিলেই সঙ্গে সঙ্গে হাত টেনে নেন—কারণ নিউরনের এই বার্তা পরিবহনের গতি অত্যন্ত দ্রুত। বিজ্ঞানীরা বলেন, একেকটি সিগন্যাল প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১২০ মিটার পর্যন্ত ছুটতে পারে!
অর্থাৎ, আমাদের দেহে বার্তা আদান-প্রদানের এই জটিল অথচ সুন্দর ব্যবস্থা প্রতিদিন নীরবে কাজ করে যাচ্ছে।
৩। নিউরনের প্রকারভেদ ও তাদের কাজ
আমাদের শরীরে কোটি কোটি নিউরন আছে। কিন্তু সব নিউরন একরকম নয়। কাজের ধরন অনুযায়ী নিউরনকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়—সেন্সরি নিউরন, মোটর নিউরন এবং ইন্টারনিউরন। প্রতিটি নিউরনের কাজ আলাদা, কিন্তু একে অপরের সাথে মিলে দেহকে সচল রাখে।
১. সেন্সরি নিউরন (Sensory Neuron):
এই নিউরন আমাদের চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। যেমন আপনি যখন ফুলের গন্ধ পান, গরম কিছু ছোঁয়, বা আলো দেখেন—তখন সেন্সরি নিউরন সেই তথ্য সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে পাঠায়। একে অনেকটা ক্যামেরার মতো ভাবা যায়, যা ছবি তুলে কম্পিউটারে পাঠায়। যদি সেন্সরি নিউরন না থাকত, তাহলে আমরা স্পর্শ, গন্ধ, স্বাদ, শব্দ বা আলো কিছুই বুঝতে পারতাম না।
২. মোটর নিউরন (Motor Neuron):
মস্তিষ্ক থেকে পাওয়া নির্দেশ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পৌঁছে দেয় মোটর নিউরন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—আপনি যদি দৌড়াতে চান, মস্তিষ্ক প্রথমে মোটর নিউরনকে বার্তা পাঠাবে। তারপর মোটর নিউরন আপনার পায়ের পেশীগুলোকে নড়াচড়ার নির্দেশ দেবে। শুধু হাঁটা বা দৌড়ানোই নয়, চোখের পলক ফেলা থেকে শুরু করে হাসা—সবই মোটর নিউরনের অবদান।
৩. ইন্টারনিউরন (Interneuron):
এই নিউরনগুলো সেন্সরি ও মোটর নিউরনের মাঝে সেতুবন্ধনের কাজ করে। একে অনেকটা মেসেঞ্জারের মতো কল্পনা করা যায়। যেমন সেন্সরি নিউরন যদি বলে “গরম!”, ইন্টারনিউরন সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য মোটর নিউরনের কাছে পৌঁছে দেবে—“হাত সরাও!”। ফলে হাত গরম জিনিস থেকে সরে যায়।
এই তিন ধরনের নিউরন একসাথে কাজ না করলে আমাদের শরীর এক মুহূর্তও সঠিকভাবে চলতে পারত না। সেন্সরি নিউরন তথ্য আনে, ইন্টারনিউরন সেই তথ্য প্রক্রিয়া করে, আর মোটর নিউরন নির্দেশ বাস্তবায়ন করে।
অর্থাৎ, নিউরনের প্রকারভেদ বোঝার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি শরীরের ভেতরে কীভাবে এক বিশাল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিনিয়ত কাজ করছে।
৪। নিউরন ও মস্তিষ্কের যোগাযোগ ব্যবস্থা
নিউরন শুধু একা কাজ করে না, বরং তারা মিলিতভাবে একটি বিশাল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে, যারা একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কই আমাদের চিন্তা করা, শেখা, মনে রাখা, এমনকি স্বপ্ন দেখার মতো কাজগুলো সম্ভব করে তোলে।
প্রতিটি নিউরনের সাথে হাজার হাজার অন্য নিউরনের সংযোগ থাকতে পারে। এই সংযোগের পয়েন্টকে বলা হয় সিন্যাপস। যখন একটি নিউরন থেকে সিগন্যাল আসে, তখন সেটি সিন্যাপসের মাধ্যমে অন্য নিউরনে পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়াই মস্তিষ্ককে একটি সুপার-কম্পিউটারের মতো করে তোলে।
ধরুন আপনি সাইকেল চালানো শিখছেন। প্রথমে হয়তো বারবার পড়ে যাচ্ছেন, কিন্তু ধীরে ধীরে নিউরনগুলো নতুন সংযোগ তৈরি করে। বারবার অনুশীলনের ফলে সেই সংযোগ আরও মজবুত হয়। একসময় আপনি সহজেই সাইকেল চালাতে পারেন, কারণ আপনার নিউরন নেটওয়ার্ক সেই কাজের জন্য অভ্যস্ত হয়ে যায়। এভাবেই শেখা এবং স্মৃতি গঠিত হয়।
মস্তিষ্কের নিউরন শুধু শরীরের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে না, তারা আমাদের আবেগ, চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং কল্পনাশক্তিও তৈরি করে। যেমন, আপনি যদি একটি গান শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে যান, সেটি আসলে নিউরনের সঠিকভাবে যোগাযোগ করার ফল।
একইসাথে, মস্তিষ্ক নিউরনের মাধ্যমে শরীরের বাকি অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি দৌড়াতে চান, প্রথমে মস্তিষ্ক মোটর নিউরনকে বার্তা পাঠায়। আবার আপনি যখন গরম কিছু স্পর্শ করেন, সেন্সরি নিউরন সঙ্গে সঙ্গে সেই বার্তা মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্ক তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং দ্রুত মোটর নিউরনকে নির্দেশ দেয় হাত সরাতে।
এভাবে নিউরন ও মস্তিষ্ক একসাথে কাজ করে আমাদের প্রতিটি কাজকে সম্ভব করে তোলে। বলা যায়, নিউরন হচ্ছে বার্তাবাহক আর মস্তিষ্ক হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র—দুজনের মিলেই আমাদের জীবন সচল থাকে।
৫। নিউরনের গুরুত্ব ও বাস্তব জীবনে ভূমিকা
নিউরন আমাদের শরীরের এমন এক উপাদান যা ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও বাঁচতে পারতাম না। ভাবুন তো, যদি নিউরন না থাকত, তাহলে আমরা কিছুই অনুভব করতে পারতাম না—গরম-ঠান্ডা বোঝা, শব্দ শোনা, আলো দেখা কিংবা সুস্বাদু খাবারের স্বাদ নেওয়া অসম্ভব হয়ে যেত। আসলে আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজেই নিউরনের ভূমিকা রয়েছে।
প্রথমত, চিন্তা ও শেখার জন্য নিউরন অপরিহার্য। স্কুলে পড়াশোনা করার সময় বা নতুন কিছু শেখার সময় নিউরন নতুন সংযোগ তৈরি করে। যত বেশি অনুশীলন করি, এই সংযোগ তত শক্তিশালী হয়। তাই পড়াশোনা বা দক্ষতা অর্জনে নিয়মিত অনুশীলন এত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, শরীরের নড়াচড়ায় নিউরনের অবদান বিশাল। আমরা হাঁটি, দৌড়াই, খেলাধুলা করি বা এমনকি আঙুল নাড়াই—সবই সম্ভব হয় মোটর নিউরনের মাধ্যমে। নিউরন যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে পেশী দুর্বল হয়ে যায়, হাত-পা ঠিকভাবে কাজ করে না। এজন্য স্নায়বিক রোগ যেমন পারকিনসন বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এত জটিল।
তৃতীয়ত, আমাদের আবেগ ও অনুভূতির সাথেও নিউরনের সম্পর্ক। আমরা যখন খুশি হই, দুঃখ পাই বা ভয় পাই—তখন মস্তিষ্কের নিউরন বিশেষ রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা আমাদের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ কারণে নিউরন শুধু শরীরের কাজ নয়, মনকেও নিয়ন্ত্রণ করে।
চতুর্থত, প্রযুক্তি ও চিকিৎসায় নিউরনের গুরুত্ব বেড়ে চলেছে। আজকাল বিজ্ঞানীরা নিউরনের কাজ বোঝার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) তৈরি করছেন। আবার চিকিৎসকরা নিউরন সম্পর্কিত গবেষণার মাধ্যমে স্নায়বিক রোগের চিকিৎসার নতুন পথ খুঁজছেন।
সবশেষে বলা যায়, নিউরন আমাদের শরীরের অদৃশ্য নায়ক। তারা চুপচাপ কাজ করে চলেছে, আর আমরা প্রতিদিন বাঁচছি, হাসছি, শিখছি, ভালোবাসছি। নিউরন ছাড়া মানুষের জীবন কল্পনাই করা যায় না।
উপসংহার
নিউরন হলো আমাদের জীবনের মূল চালিকা শক্তি। তারা মস্তিষ্কের নির্দেশ শরীরে পৌঁছে দেয় এবং শরীরের অনুভূতি আবার মস্তিষ্কে পাঠায়। এভাবে প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, নড়াচড়া—সবই নিউরনের মাধ্যমে সম্ভব হয়। আমরা যখন শিখি, হাসি, কাঁদি বা সিদ্ধান্ত নেই, তখনও নিউরন নীরবে কাজ করে যায়। তাই নিউরনকে শরীরের “বার্তাবাহক” বলা একেবারেই যথার্থ। এর কাজ বোঝা শুধু বিজ্ঞান নয়, আমাদের জীবনকেও ভালোভাবে বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ উপায়।