সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার স্বপ্ন আজকাল অনেক তরুণ-তরুণীর মাঝেই দেখা যায়। টেলিভিশনের সামনে যেসব আত্মবিশ্বাসী মানুষ খবর পড়ে, তারা শুধু খবর জানান না—দর্শকের আস্থা, বিশ্বাস এবং তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করেন। একজন দক্ষ সংবাদ উপস্থাপক হতে হলে সুন্দর উচ্চারণ, পরিষ্কার ভাষা, দ্রুত চিন্তা করার ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসী আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পেশায় শুধু মুখ দেখানো নয়, বরং সত্য তথ্য বিশ্লেষণ, সংবাদ সংগ্রহ, স্ক্রিপ্ট বুঝে বলা এবং দর্শকের সঙ্গে যুক্ত থাকার কৌশল শেখা লাগে। এই নিবন্ধে আমরা সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে দেখব—বাংলাদেশে কিভাবে একজন দক্ষ ও সফল সংবাদ উপস্থাপক হওয়া যায়।
১। সংবাদ উপস্থাপনার মৌলিক ধারণা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা
সংবাদ উপস্থাপক হতে চাইলে প্রথম কাজ হলো এই পেশাটি কী, কীভাবে কাজ করে এবং কী ধরনের দক্ষতা লাগে তা পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া। অনেকেই শুধু টিভিতে খবর পড়াকে সংবাদ উপস্থাপনা মনে করেন, কিন্তু এর মধ্যে আরও অনেক দায়িত্ব থাকে। একজন উপস্থাপককে প্রথমে সংবাদ স্ক্রিপ্ট ভালোভাবে বোঝতে হয়, এরপর নিজস্ব কণ্ঠ, অভিব্যক্তি এবং সঠিক উচ্চারণের মাধ্যমে খবর উপস্থাপন করতে হয়। তাই এই ক্ষেত্রটিকে বুঝতে হলে নিয়মিত নিউজ দেখা, উপস্থাপকদের কণ্ঠভঙ্গি ও স্টাইল পর্যবেক্ষণ করা এবং নিজেকে তুলনা করে দেখা খুব জরুরি।
সংবাদ উপস্থাপনার জন্য যে দক্ষতাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার মধ্যে অন্যতম হলো সুস্পষ্ট উচ্চারণ, অর্থাৎ কথা বলার সময় শব্দ যেন পরিষ্কার শোনা যায়। বাংলাদেশের অনেক জনপ্রিয় নিউজ অ্যাঙ্কর উচ্চারণ ও টোনের কারণে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছেন। এছাড়া ফ্লুয়েন্সি বা সাবলীলভাবে কথা বলার ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি থেমে থেমে কথা বলেন বা শব্দ আটকে যায়, তাহলে দর্শকের মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। তাই নিয়মিত জোরে জোরে পড়ার অনুশীলন, আয়নার সামনে কথা বলার প্র্যাকটিস এবং ভয়েস রেকর্ড করে নিজেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি একজন ভালো সংবাদ উপস্থাপক হতে হলে দ্রুত চিন্তা ও পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা থাকা দরকার। লাইভ সম্প্রচারের সময় অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে—টেলিপ্রম্পটার বন্ধ হয়ে যাওয়া, ভুল তথ্য আসা, স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন হওয়া—এ সময় শান্ত থাকা এবং পেশাদারভাবে পরিস্থিতি সামলানোই একজন দক্ষ উপস্থাপকের পরিচয়।
সবশেষে বলা যায়—এই ধাপে আপনাকে বুঝতে হবে যে সংবাদ উপস্থাপনা শুধুই চাকরি নয়, এটি দায়িত্ব, আত্মবিশ্বাস, জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়। এই পেশার মৌলিক জিনিসগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে পরবর্তী ধাপগুলো শেখা আরও সহজ হয়ে যায়।
২। শিক্ষা যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ
সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক উচ্চশিক্ষা নেই, তবে সাংবাদিকতা, যোগাযোগ বিজ্ঞান, বাংলা বা ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করলে এই পেশায় দ্রুত অগ্রগতি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই নিউজ প্রেজেন্টেশন, রিপোর্টিং, মিডিয়া নীতিমালা, ব্যাকরণ, টোন ও স্ক্রিপ্ট রাইটিং সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। বাংলাদেশের অনেক সংবাদ উপস্থাপক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই মিডিয়া ক্লাবে যুক্ত হন, বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নেন এবং ছোট প্রোজেক্টের মাধ্যমে উপস্থাপনার দক্ষতা বাড়ান। তাই এই ধাপে প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত—নিজেকে মৌলিক শিক্ষা ও গণমাধ্যম জ্ঞানে সমৃদ্ধ করা।
এছাড়া বিভিন্ন মিডিয়া হাউস, অনলাইন টিভি, ইউটিউব চ্যানেল বা ট্রেনিং সেন্টারে নিউজ প্রেজেন্টেশন কোর্স করা খুব উপকারী। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আপনি শিখবেন কীভাবে স্ক্রিপ্ট পড়তে হয়, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে ভয়েস মডুলেশন করা হয়, লাইভ কথোপকথন কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং ব্রেকিং নিউজের সময় কিভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এসব ট্রেনিং আপনাকে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়, যা শুধু বই পড়ে সম্ভব নয়।
সঠিক উচ্চারণ শেখাও এই ধাপের মূল অংশ। বাংলার পাশাপাশি পরিষ্কার ইংরেজি উচ্চারণ জানা অনেক নিউজরুমে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এজন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট উচ্চারণ অনুশীলন, সংবাদ পাঠ শুনে অনুকরণ করা এবং কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিদিং এক্সারসাইজ করা জরুরি। অনেক সংবাদ উপস্থাপক নিয়মিত থিয়েটারের সাথে যুক্ত হন কারণ থিয়েটার কণ্ঠস্বর, অভিব্যক্তি ও আত্মবিশ্বাস গঠনে সাহায্য করে।
সবশেষে, প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আপনাকে নিজের মধ্যে স্বশিক্ষার মনোভাব রাখতে হবে। বই পড়া, আন্তর্জাতিক সংবাদ দেখা, ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানো এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করা—এসব কাজ নিয়মিত করলে আপনি দ্রুত একজন যোগ্য সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার দিকে এগিয়ে যেতে পারবেন।
৩। কণ্ঠস্বর, উপস্থাপনা ভঙ্গি ও ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো
একজন সংবাদ উপস্থাপকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো তার কণ্ঠস্বর। পরিষ্কার, ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্থির কণ্ঠ দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। তাই প্রথম কাজ হলো নিজের কণ্ঠস্বরকে নিয়ন্ত্রণে আনা। প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে কণ্ঠ আরও শক্তিশালী ও স্থির হয়। জোরে জোরে বই পড়া, নিউজ স্ক্রিপ্ট অনুশীলন করা এবং নিজের ভয়েস রেকর্ড করে ভুলগুলো শনাক্ত করাও অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে টোন, পজ, জোর দেওয়ার জায়গা, এবং শব্দের স্পষ্টতা—এই চারটি বিষয় নিয়মিত চর্চা করলে কণ্ঠস্বর আরও পেশাদার হয়ে ওঠে।
এখন আসি উপস্থাপনা ভঙ্গি বা Presentation Style–এ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে আপনার মুখের অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি, হাতের ভঙ্গি এবং শরীরের ভরসাম্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অভিব্যক্তি অতিরিক্ত হওয়া যাবে না, আবার একদম নির্লিপ্তও হওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে—আপনি শুধু খবর পড়ছেন না, বরং দর্শকদের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি করছেন। তাই ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলা, স্বাভাবিকভাবে হাসা, অযথা হাত নড়াচড়া না করা—এসব বিষয় নিয়মিত আয়নার সামনে অনুশীলন করতে হবে।
ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস দ্রুত তৈরি হয় না; এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। প্রথমে পরিবার বা বন্ধুদের সামনে দাঁড়িয়ে নিউজ পড়ুন। তারপর মোবাইল ক্যামেরায় নিজের ভিডিও রেকর্ড করুন এবং দেখুন কোথায় সমস্যা হচ্ছে—কণ্ঠ কম্পন, চোখ এদিক-ওদিক যাওয়া, দেহের অস্বাভাবিক নড়াচড়া ইত্যাদি। এসব সমস্যা একে একে ঠিক করুন। মনে রাখতে হবে—লাইভ নিউজের সময় ভুল হলেও থেমে গেলে চলবে না; সাবলীলভাবে তা সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
এই ধাপের মূল লক্ষ্য হলো আপনার কণ্ঠস্বর, উপস্থাপনা ভঙ্গি এবং আত্মবিশ্বাসকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে ক্যামেরার সামনে আপনি স্বাভাবিক, দৃঢ় এবং পেশাদার দেখান। এই তিনটি দক্ষতা ভালোভাবে রপ্ত করতে পারলে একজন সফল সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
৪। বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন ও পোর্টফোলিও তৈরি
সংবাদ উপস্থাপক হতে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান বা অনুশীলন যথেষ্ট নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। কারণ বাস্তব পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে আপনি বুঝতে পারবেন কীভাবে নিউজরুম চলে, কীভাবে স্ক্রিপ্ট আসে, এবং লাইভ পরিস্থিতি কত দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। তাই শুরুতে ছোট প্ল্যাটফর্মে কাজ করা খুবই উপকারী—যেমন অনলাইন টিভি, ক্যাম্পাস টেলিভিশন, রেডিও, কিংবা ইউটিউব চ্যানেল। এসব জায়গায় আপনি কম চাপের মধ্যে উপস্থাপনার অনুশীলন করতে পারবেন এবং বাস্তব কাজের স্বাদ পাবেন।
এই ধাপে আপনার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত—অভিজ্ঞতা সংগ্রহ। যত বেশি অভিজ্ঞতা হবে, আপনার স্কিল তত দ্রুত বাড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনলাইন নিউজ চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত লাইভ শো বা সংবাদ উপস্থাপনা করলে আপনি ক্যামেরার ভয় দূর করতে পারবেন, নিজের ভুল ধরে সংশোধন করতে পারবেন, এবং দর্শকের প্রতিক্রিয়াও পাবেন। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে ও উপস্থাপনা শক্তি অনেক উন্নত হবে। এ ধরনের বাস্তব কাজ আপনাকে ভবিষ্যতে বড় মিডিয়া হাউসে চাকরি পাওয়ার সুযোগও সহজ করে দেয়।
এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করতে হবে। পোর্টফোলিও বলতে বোঝায়—আপনার করা সেরা ভিডিও, রেকর্ডিং, প্রেজেন্টেশন, এবং অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। এটি আপনার পরিচয়পত্রের মতো কাজ করে। যখন আপনি কোনো টিভি চ্যানেল বা মিডিয়ায় চাকরির জন্য আবেদন করবেন, তখন আপনার শক্তিশালী পোর্টফোলিও দেখে তারা সহজেই বুঝতে পারবে আপনি কতটা দক্ষ। পোর্টফোলিওতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত—নিজের পরিচয় ভিডিও, নিউজ উপস্থাপনার ভিডিও ক্লিপ, ভয়েস ওভার কাজ, এবং যেকোনো মিডিয়া-সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা।
সবশেষে, আপনার শেখার ইচ্ছা থাকতে হবে। ভুল করলে ভয় পাবেন না; বরং ভুল চিনে ঠিক করার মানসিকতা রাখুন। বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সুসংগঠিত পোর্টফোলিও আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলবে এবং একজন দক্ষ সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার পথে এগিয়ে দেবে।
৫। চাকরির সুযোগ, ইন্টারভিউ প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক উন্নতি
সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার শেষ ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক জায়গায় আবেদন করা এবং নিজের দক্ষতাকে নিয়মিত উন্নত করা। বাংলাদেশে বর্তমানে অসংখ্য টিভি চ্যানেল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ওয়েব টিভি এবং রেডিও প্ল্যাটফর্ম আছে—যেখানে নবীন উপস্থাপকদের প্রয়োজন হয়। শুরুতে বড় চ্যানেলে সুযোগ নাও মিলতে পারে, কিন্তু ছোট প্ল্যাটফর্মে কাজ করলে আপনার অভিজ্ঞতা বাড়বে এবং পরবর্তীতে বড় মিডিয়া হাউসে প্রবেশ করা সহজ হবে। তাই নিয়মিত চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখুন, নিজস্ব পোর্টফোলিও পাঠান এবং নেটওয়ার্কিং বাড়ান। সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট সেমিনার, ওয়ার্কশপ এবং ইভেন্টে অংশগ্রহণ করলে নতুন সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়ে।
ইন্টারভিউ প্রস্তুতি এই ধাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইন্টারভিউতে সাধারণত আপনাকে একটি নিউজ স্ক্রিপ্ট পড়ে দেখাতে বলা হয় বা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট কথা বলার পরীক্ষা নেওয়া হয়। তাই আগেই বিভিন্ন ধরনের স্ক্রিপ্ট অনুশীলন করুন—রাজনীতি, খেলাধুলা, আন্তর্জাতিক সংবাদ, বিনোদন ইত্যাদি বিষয়ের নমুনা স্ক্রিপ্ট পড়ুন। ইন্টারভিউয়ের সময় পরিচ্ছন্ন পোশাক, নির্ভুল উচ্চারণ এবং আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া প্রশ্নোত্তর পর্বে মিডিয়া নীতিমালা, ব্রেকিং নিউজ পরিচালনা, লাইভ ভুল সংশোধন, এবং নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ভালোভাবে বলতে পারলে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
এই পেশায় সফল হতে হলে ধারাবাহিক উন্নতি অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন খবর পড়ুন, আন্তর্জাতিক সংবাদ দেখুন, ভাষার ভুল ঠিক করুন, নতুন শব্দ শিখুন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দায়িত্বশীল আচরণ করুন। কারণ সংবাদ উপস্থাপকের প্রতিটি কথা দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। নিজের পুরনো ভিডিও দেখুন এবং কীভাবে আরও উন্নতি করা যায় তা বিশ্লেষণ করুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ উপস্থাপকদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিন। যত বেশি শিখবেন, তত বেশি দক্ষ হবেন।
সবশেষে মনে রাখবেন—সংবাদ উপস্থাপনা শুধু চাকরি নয়; এটি একটি সম্মানজনক দায়িত্ব। ধারাবাহিক অনুশীলন, সঠিক প্রস্তুতি, ভালো আচরণ এবং সত্যতাকে সম্মান করা—এসব গুণই আপনাকে একজন সফল সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার উপায় সম্পর্কে 20 টি সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর।
প্রশ্ন–১: সংবাদ উপস্থাপক হতে কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন?
উত্তর: সংবাদ উপস্থাপক হতে সবচেয়ে প্রয়োজন পরিষ্কার উচ্চারণ, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর এবং সাবলীলভাবে কথা বলার ক্ষমতা। এছাড়া বাংলা ভাষায় দক্ষতা, মৌলিক ইংরেজি জ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে বুঝতে পারা জরুরি। উপস্থাপনার সময় তথ্যকে সঠিকভাবে বোঝা এবং দর্শকের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরাই মূল কাজ।
একজন উপস্থাপকের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা, যোগাযোগ বিজ্ঞান, বাংলা বা ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করলে সুবিধা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি দরকার অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা। ভয়েস ট্রেনিং, ক্যামেরার সামনে স্টাইল উন্নত করা এবং বাস্তব প্র্যাকটিস—এই দক্ষতাগুলো তৈরি করতে পারলে সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার পথ অনেক সহজ হয়ে যায়।
প্রশ্ন–২: সংবাদ উপস্থাপনার জন্য কি সাংবাদিকতায় ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার জন্য সাংবাদিকতায় ডিগ্রি বাধ্যতামূলক নয়, তবে থাকলে অবশ্যই বড় সুবিধা পাওয়া যায়। সাংবাদিকতা বা যোগাযোগ বিষয়ে পড়লে সংবাদ নির্মাণ, রিপোর্টিং, মিডিয়া নীতি, ভাষার ব্যবহার এবং উপস্থাপনা কৌশল সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি হয়। এটি আপনাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় আরও আত্মবিশ্বাসী ও প্রস্তুত করে।
তবে ডিগ্রি না থাকলেও নিয়মিত অনুশীলন, প্রশিক্ষণ এবং নিজের দক্ষতা উন্নত করলে আপনি সংবাদ উপস্থাপক হতে পারবেন। অনেক সফল উপস্থাপক বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—উচ্চারণ, কণ্ঠস্বর, উপস্থাপনা ভঙ্গি, সংবাদ বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ক্যামেরার সামনে প্রাকটিস। এগুলো ঠিক থাকলে ডিগ্রি না থাকলেও সুযোগ পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন–৩: একজন সংবাদ উপস্থাপকের জন্য কণ্ঠস্বর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: একজন সংবাদ উপস্থাপকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার কণ্ঠস্বর। পরিষ্কার, স্থির এবং শ্রুতিমধুর কণ্ঠ দর্শকের কাছে বিশ্বাস তৈরি করে। খবর পড়ার সময় শব্দ স্পষ্ট হওয়া, টোন সঠিক থাকা এবং গতি নিয়ন্ত্রিত থাকা খুব জরুরি। তাই কণ্ঠস্বরকে পেশাদারভাবে গড়ে তোলার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, জোরে বই পড়া, এবং ভয়েস রেকর্ড করে নিজেকে শোনা প্রয়োজন।
কণ্ঠস্বর ভালো হলেও সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা শিখতে হয়। কোন জায়গায় জোর দিতে হবে, কোথায় বিরতি হবে, কোন টোনে কোন সংবাদ পড়তে হয়—এসব বিষয় নিয়মিত চর্চায় উন্নত হয়। ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে কণ্ঠকে স্থিতিশীল রাখা একজন উপস্থাপকের পরিচয়। তাই কণ্ঠের যত্ন নেওয়া এই পেশায় সফলতার মূল চাবিকাঠি।
প্রশ্ন–৪: সংবাদ উপস্থাপনার জন্য ক্যামেরার সামনে কেমন আচরণ থাকা উচিত?
উত্তর: ক্যামেরার সামনে একজন সংবাদ উপস্থাপককে অবশ্যই আত্মবিশ্বাসী ও স্বাভাবিকভাবে আচরণ করতে হবে। অতিরিক্ত হাত নড়াচড়া বা অযথা মুখভঙ্গি দেখানো ঠিক নয়। চোখ সরাসরি ক্যামেরার দিকে রাখতে হবে এবং মুখে স্বাভাবিক অভিব্যক্তি রাখতে হবে। এই ভঙ্গি দর্শকের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ গড়ে তোলে।
সফল উপস্থাপকরা ক্যামেরার সামনে স্থির থাকেন এবং কথা বলার সময় ধীর গতি বজায় রাখেন। প্রয়োজনে হাতের হালকা ভঙ্গি ব্যবহার করতে পারেন, তবে সবসময় বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত আয়নার সামনে অনুশীলন বা ভিডিও রেকর্ড করে নিজেকে বিশ্লেষণ করলে এই দক্ষতা আরও উন্নত হয়।
প্রশ্ন–৫: একজন সংবাদ উপস্থাপককে কী ধরনের তথ্য জানা উচিত?
উত্তর: সংবাদ উপস্থাপককে সর্বদা সাম্প্রতিক ঘটনা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবর, রাজনৈতিক পরিবর্তন, খেলাধুলা, অর্থনীতি এবং সামাজিক বিষয় সম্পর্কে আপডেট থাকা উচিত। দর্শকরা শুধুমাত্র খবর শুনতে চান না, তারা জানার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক বিশ্লেষণও আশা করেন। তাই সংবাদ উপস্থাপককে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান রাখতে হয়।
এছাড়া, প্রাসঙ্গিক শব্দভাণ্ডার ও ভাষাগত দক্ষতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। নিউজ স্ক্রিপ্ট পড়ার সময় শব্দগুলি সঠিকভাবে বোঝা, বাক্যরীতি অনুধাবন করা এবং তা পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। তথ্যের উপর দখল থাকলে উপস্থাপনা আরও প্রভাবশালী হয় এবং দর্শকের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন–৬: সংবাদ উপস্থাপনার জন্য ভয়েস ট্রেনিং কতটা প্রয়োজন?
উত্তর: ভয়েস ট্রেনিং সংবাদ উপস্থাপকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করে না, বরং উচ্চারণ, টোন, পজ এবং রিদম নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে। নিয়মিত ভয়েস এক্সারসাইজ করলে দীর্ঘ সময় খবর পড়ার সময়ও কণ্ঠস্বর স্থির থাকে এবং শ্রোতার কাছে তথ্য পরিষ্কার পৌঁছায়।
ভয়েস ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত কথা বলা, কঠিন শব্দ উচ্চারণ করা, এবং লম্বা সংবাদ পড়ার সময় শ্বাস নিয়ন্ত্রণ শেখা সম্ভব। অনেক পেশাদার উপস্থাপক প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিটের ভয়েস অনুশীলন করেন। এছাড়া প্রফেশনাল কোর্স বা অনলাইন ভিডিও দেখে কৌশল শিখলেও দক্ষতা বাড়ে।
প্রশ্ন–৭: লাইভ সম্প্রচারে সংবাদ উপস্থাপকের জন্য কী চ্যালেঞ্জ থাকে?
উত্তর: লাইভ সম্প্রচারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মুহূর্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া। টেলিপ্রম্পটার কাজ না করা, স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন, বা হঠাৎ কোনো খবরের আপডেট—এসব পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা ও পেশাদারভাবে তা সামলানো জরুরি। দর্শক লাইভ দেখতে থাকেন, তাই ভুল হলেও সাবলীলভাবে তা সামলে এগোতে হয়।
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সময় ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি সেগমেন্টে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খবর পড়া প্রয়োজন। দ্রুত বা ধীর গতিতে পড়লে সমন্বয় হারিয়ে যায়। এজন্য আগেই প্র্যাকটিস করা, টাইমার ব্যবহার করা এবং লাইভ পরিস্থিতি অনুশীলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন–৮: সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে কিভাবে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো যায়?
উত্তর: আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য নিয়মিত অনুশীলন অপরিহার্য। নিজের ভিডিও রেকর্ড করে দেখুন, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে স্ক্রিপ্ট পড়ুন, এবং নিজের ত্রুটি শনাক্ত করুন। প্রাথমিক সময় বন্ধু বা পরিবারের সামনে অনুশীলন করা সহায়ক হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
আরও একটি কৌশল হলো ভালো প্রস্তুতি নেওয়া। সংবাদ বিষয়গুলো আগে থেকে পড়া, স্ক্রিপ্ট বোঝা এবং সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত রাখা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ ও ভয়েস মডুলেশনও আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করে। এই সব কৌশল মিলিয়ে একজন সফল উপস্থাপক ক্যামেরার সামনে স্থির ও প্রভাবশালী থাকেন।
প্রশ্ন–৯: সংবাদ উপস্থাপকের জন্য কোন সফট স্কিলগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: সংবাদ উপস্থাপকের জন্য সফট স্কিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো যোগাযোগ দক্ষতা। দর্শকের সঙ্গে তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া, সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করা—এসব স্কিল পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সফট স্কিল হলো সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। লাইভ শো চলাকালীন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, শান্ত থাকা এবং সমাধান খুঁজে বের করা খুব জরুরি। সময় ব্যবস্থাপনা, মনোযোগ কেন্দ্রিত রাখা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা—এসব স্কিলও একজন সফল সংবাদ উপস্থাপককে আলাদা করে তোলে।
প্রশ্ন–১০: সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার জন্য অনুশীলন কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর: সংবাদ উপস্থাপক হওয়ার জন্য নিয়মিত ও পরিকল্পিত অনুশীলন অপরিহার্য। প্রতিদিন স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনার মাধ্যমে উচ্চারণ, টোন এবং বাক্য গঠন উন্নত করা যায়। নিজেকে ভিডিও রেকর্ড করে বিশ্লেষণ করা, ভুল শনাক্ত করা এবং সংশোধন করা এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এছাড়া, ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী হতে আয়নার সামনে অনুশীলন করুন। লাইভ পরিস্থিতির নকল তৈরি করে টাইমার ব্যবহার করা, দ্রুত তথ্য উপস্থাপনার অনুশীলন এবং সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত রাখা—এসব কাজ ধারাবাহিকভাবে করলে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত অনুশীলন একজন পেশাদার সংবাদ উপস্থাপক গড়ে তোলে।
প্রশ্ন–১১: সংবাদ উপস্থাপকের জন্য ক্যামেরার সামনে ভঙ্গি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ক্যামেরার সামনে ভঙ্গি একজন সংবাদ উপস্থাপকের জন্য দর্শকের কাছে প্রভাব ফেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। স্থির ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি দর্শককে বিশ্বাস দেয় যে উপস্থাপক তথ্য নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হাত-হাতেলি কম রাখা, চোখ সরাসরি ক্যামেরায় রাখা এবং মুখে স্বাভাবিক অভিব্যক্তি রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ভঙ্গি কেবলই উপস্থিতি নয়, এটি দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতেও সাহায্য করে। অযথা নড়াচড়া, অতিরিক্ত হাত-চলাচল বা অস্বাভাবিক হেসে যাওয়া তথ্যের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। নিয়মিত আয়নার সামনে অনুশীলন এবং ভিডিও রেকর্ড করে নিজের ভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করলে দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন–১২: লাইভ নিউজে ভুল হলে কিভাবে সামলাবেন?
উত্তর: লাইভ নিউজে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো শান্ত থাকা এবং পরিস্থিতি দ্রুত সামলানো। কোনো তথ্য ভুল হলে তা স্বীকার করে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করুন। দর্শক প্রফেশনাল আচরণ লক্ষ্য করে এবং এটি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখে।
সংশোধনের সাথে সাথে কণ্ঠস্বর ও ভঙ্গি স্বাভাবিক রাখুন। থেমে থেমে কথা বললে দর্শকের মনোযোগ হারিয়ে যেতে পারে। নিয়মিত অনুশীলন, প্র্যাকটিস শো এবং পোর্টফোলিও তৈরির মাধ্যমে লাইভ পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন–১৩: সংবাদ উপস্থাপকের জন্য সময় ব্যবস্থাপনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর:
সংবাদ উপস্থাপকের কাজ সময়ের সঙ্গে অনেকটা সম্পর্কিত। লাইভ শো বা নিউজ সেগমেন্টে প্রতিটি সংবাদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উপস্থাপন করতে হয়। দ্রুত বা ধীর পড়লে সমন্বয় হারিয়ে যায় এবং দর্শকের মনোযোগ কমে। তাই ভালো সময় ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।
সময়সূচি মেনে কাজ করার জন্য স্ক্রিপ্ট আগে থেকে পড়া, টাইমার ব্যবহার করা এবং প্র্যাকটিস করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নিয়মিত অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা অর্জন সময় নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা বৃদ্ধি করে। সময় ব্যবস্থাপনা একজন পেশাদার উপস্থাপককে আত্মবিশ্বাসী এবং প্রভাবশালী রাখে।
প্রশ্ন–১৪: সংবাদ উপস্থাপনার জন্য কোন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন?
উত্তর: সংবাদ উপস্থাপনার জন্য প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ খুবই কার্যকর। এতে শেখানো হয় কিভাবে স্ক্রিপ্ট পড়তে হয়, কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ, টোন ও ভঙ্গি ব্যবস্থাপনা, লাইভ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ করা। প্রশিক্ষণ আপনাকে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেয়, যা শুধু বই পড়ে সম্ভব নয়।
অনলাইন কোর্স, মিডিয়া ট্রেনিং সেন্টার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ক্লাব সবই প্রশিক্ষণের জন্য ভালো জায়গা। এছাড়া অভিজ্ঞ সংবাদ উপস্থাপকের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করলে দক্ষতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রশিক্ষণ একজন নবীনকে পেশাদার পর্যায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন–১৫: সংবাদ উপস্থাপকের জন্য সংবাদ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: সংবাদ উপস্থাপকের জন্য শুধু খবর পড়া যথেষ্ট নয়; তা বিশ্লেষণ করতে পারাও জরুরি। দর্শক কেবল তথ্য জানতে চায় না, তারা চাই নির্ভুল এবং প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা। এজন্য উপস্থাপককে সংবাদ বোঝা, প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করা এবং সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
বিশ্লেষণ ক্ষমতা থাকলে লাইভ শোতে প্রশ্ন বা হঠাৎ আপডেটের সময় দ্রুত সঠিক তথ্য দিতে পারেন। এছাড়া সংবাদ উপস্থাপনার মান উন্নত হয় এবং দর্শকের আস্থা বৃদ্ধি পায়। নিয়মিত বিভিন্ন উৎস থেকে খবর পড়া এবং বিশ্লেষণ চর্চা করা এই দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
প্রশ্ন–১৬: সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে সফল হওয়ার জন্য নেটওয়ার্কিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: নেটওয়ার্কিং একজন সংবাদ উপস্থাপকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহকর্মী, সাংবাদিক ও মিডিয়া পেশাজীবীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করলে নতুন সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং তথ্য প্রবাহ সহজ হয়। এছাড়া অভিজ্ঞদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নেওয়া, পরামর্শ গ্রহণ করা এবং নিজের কাজের মান উন্নত করা সম্ভব হয়।
নেটওয়ার্কিং শুধু পেশাগত সুবিধা দেয় না, এটি মানসিক সহায়তাও প্রদান করে। মিডিয়া ইভেন্ট, সেমিনার, ওয়ার্কশপ এবং অনলাইন ফোরামে অংশগ্রহণ করে নেটওয়ার্কিং বাড়ানো যায়। এটি ভবিষ্যতে বড় মিডিয়া হাউসে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করে।
প্রশ্ন–১৭: একজন সংবাদ উপস্থাপককে কীভাবে লাইভ শো-তে প্রস্তুত থাকতে হবে?
উত্তর: লাইভ শোতে প্রস্তুত থাকার জন্য উপস্থাপককে স্ক্রিপ্ট আগে থেকে পড়া এবং বিষয়ভিত্তিক নোট তৈরি করতে হবে। প্রতিটি সংবাদবস্তুর প্রাসঙ্গিক তথ্য জানা, সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত রাখা এবং লাইভ পরিস্থিতির জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকা জরুরি।
শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, কণ্ঠস্বর স্থির রাখা এবং ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত অনুশীলন এবং প্র্যাকটিস শো-তে অংশগ্রহণ করে এই প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা যায়।
প্রশ্ন–১৮: সংবাদ উপস্থাপনার জন্য সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: আজকের যুগে সামাজিক মাধ্যম একজন সংবাদ উপস্থাপকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এতে তারা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পারেন, খবরের আপডেট দিতে পারেন এবং নিজের পেশাগত পরিচিতি তৈরি করতে পারেন। সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে শ্রোতার প্রতিক্রিয়া দ্রুত জানা যায় এবং উপস্থাপনা মান উন্নত করা যায়।
তবে এটি দায়িত্বসহ ব্যবহার করা উচিত। কোনো ভুল বা অপ্রমাণিত তথ্য শেয়ার করা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় পেশাদারিত্ব বজায় রাখা, নির্ভুল তথ্য শেয়ার করা এবং দর্শকের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ রাখা জরুরি।
প্রশ্ন–১৯: একজন নবীন সংবাদ উপস্থাপককে প্রথম কাজের জন্য কীভাবে প্রস্তুত হতে হবে?
উত্তর: নবীন সংবাদ উপস্থাপক প্রথম কাজের জন্য প্রস্তুত হতে হলে ভালোভাবে স্ক্রিপ্ট পড়া, কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণ অনুশীলন করা এবং ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ছোট প্ল্যাটফর্ম বা অনলাইন চ্যানেল থেকে শুরু করলে অভিজ্ঞতা অর্জন সহজ হয়।
পরীক্ষামূলক শো, ফ্রেন্ডস বা পরিবারের সামনে অনুশীলন, ভিডিও রেকর্ড এবং নিজের ভুল শনাক্ত করে সংশোধন করা নবীনদের জন্য উপকারী। পোর্টফোলিও তৈরি এবং প্রফেশনাল কোর্সে অংশগ্রহণ করলে চাকরির জন্য প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হয়।
প্রশ্ন–২০: একজন সংবাদ উপস্থাপক কীভাবে ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা উন্নত করতে পারে?
উত্তর: ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা উন্নত করতে সংবাদ উপস্থাপককে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। প্রতিদিন নিউজ পড়া, নতুন শব্দ শেখা, স্ক্রিপ্ট পড়ার অভ্যাস, ভয়েস ট্রেনিং এবং ক্যামেরার সামনে অনুশীলন—এসব কাজ ধারাবাহিকভাবে করলে দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া নিজের ভিডিও রেকর্ড করে ভুলগুলো বিশ্লেষণ করা খুব কার্যকর।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফিডব্যাক নেওয়া। অভিজ্ঞ সহকর্মী বা প্রশিক্ষকের পরামর্শ মেনে নিজেকে সংশোধন করলে ধারাবাহিক উন্নতি হয়। নতুন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও উপস্থাপনার মান উন্নত করে এবং ক্যারিয়ারকে আরও সফল করে।