বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আবারও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে। মূলত আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের সামান্য হ্রাসের কারণে এই ঘাটতি বেড়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সম্প্রতি প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্ট (BOP)–এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় বাণিজ্য ঘাটতি দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি কিছুটা কমেছে, তবুও অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
আমদানি বেড়েছে, রপ্তানি কমেছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশের মোট আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সময়ে আমদানি ব্যয় ৩৮.১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৯.৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে একই সময়ে রপ্তানি আয় কিছুটা কমে ২৬.৩৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৬.০৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এই দুইয়ের ব্যবধানই মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে নানা অস্থিরতা ও আমদানি নির্ভর অর্থনীতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আমদানি বাড়া এবং রপ্তানি কমার ফলে বাণিজ্য ঘাটতি স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে।
রেমিটেন্স বাড়ায় চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে
যদিও বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে, তবুও একটি ইতিবাচক দিক হলো রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশে মোট ১৯.৪৩ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৫.৯৬ বিলিয়ন ডলার।
এই শক্তিশালী রেমিটেন্স প্রবাহের কারণে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- চলতি বছর: ৩৮১ মিলিয়ন ডলার ঘাটতি
- গত বছর একই সময়ে: ১.৩৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
আর্থিক হিসাবে বড় উদ্বৃত্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের আর্থিক হিসাবে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত দেখা গেছে।
অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ৩৩১ মিলিয়ন ডলার।
এই উন্নতির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
- ট্রেড ক্রেডিট পরিস্থিতির উন্নতি
- বিদেশি সহায়তার প্রবাহ বৃদ্ধি
- আমদানি অর্থায়নের ইতিবাচক পরিবর্তন
ট্রেড ক্রেডিট খাতে এবার ১.০৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে গত বছর একই সময়ে ১.২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল।
সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উন্নতি
আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে উন্নতি।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের মোট লেনদেন ভারসাম্যে ২.২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে।
অন্যদিকে গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১.২২ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিটেন্স বৃদ্ধি এবং আর্থিক হিসাবের উন্নতির কারণেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
ইরান–ইসরাইল সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক ইরান–ইসরাইল সংঘাত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ডলারের বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে।
ইতিমধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ দেখা যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহে ডলারের দাম প্রায় ৭০ পয়সা বেড়ে ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে। এর আগে এটি ছিল প্রায় ১২২.৩০ টাকা।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে—
- বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা
- ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করা
- বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য বজায় রাখা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে অত্যন্ত সতর্কভাবে নীতিমালা পরিচালনা করতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও শক্তিশালী রেমিটেন্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং ডলারের বাজারের অস্থিরতার কারণে সামনে অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।